৩য় মৃত্যুবার্ষিকী : ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানের অমর শিল্পী আবদুল জব্বার

Published: Sun, 30 Aug 2020 | Updated: Sun, 30 Aug 2020

রোকন উদ্দীন আহমদ : খোদা প্রদত্ত প্রতিভা নিয়ে পৃথিবীতে কেউ কেউ জন্মগ্রহণ করে ইতিহাসে স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করেন। বাঙালি সংস্কৃতিতে তেমনই এক মোহিনীশক্তির কণ্ঠশিল্পীর নাম আবদুল জব্বার। পৃথিবী থেকে তিনি চিরবিদায় নিলেও বাঙালির হৃদয় থেকে তাঁর কণ্ঠ বিদায় হয়নি। সুস্থ সংস্কৃতি-সংগীত চর্চায় এবং দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হতে তাঁর কণ্ঠ যুগ যুগ ধরে থাকবে সজীব ও সরব। ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘ওরে নীল দরিয়া’, ‘তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়’ এরকম অসংখ্য জীবনঘনিষ্ঠ আর প্রাণছোঁয়া গান তাঁকে বাঙালির হৃদয়ে অনন্তকাল বাঁচিয়ে রাখবে। তাঁর অসামান্য কীর্তিই তাঁকে অমর করে রাখবে।

আবদুল জব্বার ছিলেন গণমানুষের শিল্পী। গণমানুষের প্রতি তাঁর ছিল অকৃত্রিম মমত্ববোধ। এই বোধ থেকেই তিনি ১৯৭১ সালে গণমানুষের আকাঙ্খিত স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠ সৈনিক হয়ে। মহান মুক্তিযুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষ যার যার অবস্থান থেকে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বার সাংস্কৃতিক জগত থেকে কণ্ঠ সৈনিক হিসাবে মুক্তির লড়াই করেছেন। 

আবদুল জব্বারের জন্ম বাউল-বৈষ্ণবের জেলা কুষ্টিয়ায়। ১৯৩৮ সালের ৭ নভেম্বর এই ক্ষণজন্মা বাঙালি জন্মগ্রহণ করেন। লালন ফকিরের স্মৃতিভূমির উদার প্রকৃতিতে বেড়ে উঠেন। এ কারণে তিনি জনগণের শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন। জনগণের শিল্পী ছিলেন বলেই তিনি জাতির মুক্তির আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেরি করেননি। উল্লেখ্য, ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনেও তিনি সাংস্কৃতিক কর্মী হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি তখন গণসংগীতে শ্রোতার মনে দেশপ্রেমে জাগিয়ে তুলতেন। 

‘৬৯ সালের উত্তাল গণআন্দোলনে আন্দোলন শাণিত করতে তিনি রাজপথে গান গেয়েছেন। এই প্রসঙ্গে গণআন্দোলনে অংশ নেওয়া একজন কণ্ঠশিল্পী বুলবুল মহলানবীশের স্মৃতিচারণ, ‘৬৯ এর ছাত্র আন্দোলন যখন গণঅভ্যুত্থানের আকার ধারণ করল, তখন আমরা রাজপথে মিছিল করছি, মিটিং করছি, পুলিশের লাঠির বাড়ি খাচ্ছি, টিয়ারশেল ফাটছে, চোখে অন্ধকার, আলোর খোঁজে ছুটছি এদিক-ওদিক। সারা বাংলা তখন উত্তাল। সংস্কৃতিকর্মীরা তখন একত্রিত হয়ে বিভিন্ন স্থানে আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। তখন মাঝে মধ্যে জব্বার ভাইয়ের সঙ্গে একসাথে রাজপথে গান গেয়েছি।’ 

১৯৬৯ সালে তিনি ‘বিমূর্ত’ নামে একটি সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। গড়ে তোলেন বঙ্গবন্ধু শিল্পীগোষ্ঠী। এই শিল্পীগোষ্ঠীর সভানেত্রী ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। এই সময়ে আবদুল জব্বার জনপ্রিয় প্লেব্যাক শিল্পী ছিলেন। উল্লেখ্য, আবদুল জব্বার ১৯৬৪ সালে উর্দু চলচিত্র ‘সঙ্গমে’ প্লেব্যাক করে সবার নজর কাড়েন। চলচিত্রে প্লেব্যাকের আরো অনেক প্রস্তাব পান। তারপরেও গণআন্দোলনে জনতার কাতারে শামিল হয়েছেন। জনপ্রিয় অবস্থায় থেকেও গণআন্দোলনে সময় দিতে পিছপা হননি।

বঙ্গবন্ধু পরিবারের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন তিনি। বঙ্গন্ধুর স্নেহধন্য ছিলেন এই তরুণ শিল্পী। ২৫ মার্চেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তিনি দেখা করেছিলেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্র্যাকডাউন ও বাঙালির উপর ভয়ালতম গণহত্যার পর তিনি ঢাকা থেকে সীমান্তের দিকে পাড়ি জমান। কলকাতায় গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর কণ্ঠে একের পর এক দেশাত্ববোধক গানে মুক্তিযুদ্ধের প্রাণ সঞ্চার হয়। তাঁর উদার কণ্ঠে তখন ভেসে আসত ‘সালাম সালাম হাজার সালাম, সকল শহীদ স্মরণে’, ‘অনেক রক্ত দিয়েছি মোরা’, ‘আমি এক বাংলার মুক্তিসেনা’, ‘বাংলার স্বাধীনতা আনল কে- মুজিব মুজিব’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘অনেক রক্ত দিয়েছি আমরা দেব যে আরও এ জীবনপণ’, ‘আকাশে বাতাসে লেগেছে কাঁপন’, ‘আয়রে বাঙালী ডাকিছে রণ’, ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের আর একটি নাম মুজিবর, মুজিবর, মুজিবর’ ইত্যাদি। তাঁর আরো একটি শ্রেষ্ঠ গান ‘হাজার বছর পরে আবার এসেছি ফিরে, বাংলার বুকে আছি দাঁড়িয়ে’। গ্রাম-বাংলায় মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে উদ্বুদ্ধ করল তাঁর আরো একটি গান, ‘মুজিব বাইয়া যাওরে, নির্যাতিত দেশের মাঝে জনগণের নাউরে মাঝি’। 

এছাড়া ‘আমার দেশের মান দেব না প্রাণ থাকিতে’, ‘অবাক পৃথিবী দেখো রূপসী বাংলার রুদ্রমূর্তি কাব্যকুঞ্জের অপরূপ সুষমায় ভরা’ প্রভৃতি গান। তখন বন-জঙ্গলে, ট্রেঞ্চে, যুদ্ধশিবিরে, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে, ফিল্ড হাসপাতালে, গ্রেনেড হাতে, রাইফেল হাতে, সমরাঙ্গণে জীবন বাজি রেখে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা মুক্তিযোদ্ধারা ছোট্ট রেডিওতে গান শুনে অন্তরে গেঁথে নিতেন স্বাধীনতার মন্ত্র। মুক্তিযুদ্ধের নয়টি মাসে তাঁর গানগুলো স্বাধীনতাকামী বাঙালিকে স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনতে প্রেরণা যুগিয়ে গেছে। এরকম অনেক গান তাঁকে বাঙালির হৃদয়ে অমর করে রেখেছে। 

সমরাঙ্গণের একজন মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে সেদিন তাঁর অবদান কোনো অংশে কম ছিল না। তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পর্ব হলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে যেসব কণ্ঠযোদ্ধা অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন আবদুল জব্বার তাঁদের মধ্যে অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে যাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুকে অত্যন্ত বিনয় ও পিতৃতুল্য মনে করে সম্বোধন করতেন ‘বাবা’। আবদুল জব্বার সবসময় দেশের নামটি বুকে ধারণ করতেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ লালন এবং মানুষের কথা চিন্তা করতেন। ফলে আবদুল জব্বারের গান মানুষ ভালবেসে যুগ যুগ ধরে নিজের অনুভূতির সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছে।

আবদুল জব্বার সর্বদাই ছিলেন জনগণের শিল্পী। তাই তাঁর কণ্ঠে চলচিত্রের গানগুলো বেশি জনপ্রিয় হয়েছে। পর্দায় এগুলো রূপ পেয়েছে শ্রমজীবীর চরিত্রে। ‘এতটুকু আশা’ ছবিতে ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’ গানটি আজও স্থায়ী হয়ে আছে দর্শক-শ্রোতার হৃদয়ে। সত্য সাহার সুরে আবদুল জব্বারের দরদি কণ্ঠে গাওয়া গানটি মানুষের প্রাণ ছুঁয়েছিল। আবদুল জব্বারের নাম বললে যে গানটি সর্বপ্রথম মনের আয়নায় ভেসে ওঠে সেটি হচ্ছে ‘ওরে নীল দরিয়া’। 

শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারের কালজয়ী উপন্যাস ‘সারেং বউ’ অবলম্বনে ‘সারেং বউ’ চলচিত্র পরিচালনা করেছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। ‘সারেং বউ’ চলচিত্রে দেখা যায়, একজন প্রবাসী কদম সারেং বহুদিন পর ফিরেছে তাঁর জন্মভিটায়। ফিরেছে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর কাছে। অমর চলচিত্রটিতে ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানের মধ্যে একজন প্রবাসী নাবিকের তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর জন্য প্রেম ও জন্মভূমির জন্য আকুলতা ফুটে ওঠে। চলচিত্রের পর্দায় চরিত্রটি রূপ দিয়েছেন শক্তিমান অভিনেতা ফারুক। আবদুল জব্বার দেশপ্রেমিক ছিলেন বলেই এই গানটি তিনি এত সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। আবদুল জব্বার ছাড়া এই গানটি অন্য কোনো শিল্পী যথাযথভাবে গাইতে পারবেন কি না প্রশ্ন জাগে। ‘সারেং বউ’ চলচিত্রটিতে শক্তিমান অভিনেতা ফারুকের অভিনয়ের সাথে গানটি যারা দেখেছেন ও শুনেছেন তারা তা বুঝবেন। এই গানে একজন শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের আবেগকে পুরোপুরি কণ্ঠে ধারণ করতে পেরেছিলেন আবদুল জব্বার। 

এছাড়া স্বাধীন বাংলাদেশে ‘মানুষের মন’, ‘স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা’, ‘ঝড়ের পাখি’, ‘সারেং বউ’, ‘আলোর মিছিল’, ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘তুফান’, ‘অঙ্গার’, ‘সখি তুমি কার’, ‘কলমিলতা’ সিনেমায় আবুদল জব্বারের গাওয়া গানগুলো জনপ্রিয়তা পায়। এর মধ্যে ১৯৭৮ সালের ‘সারেং বউ’ সিনেমার ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানটি তাঁকে খ্যাতির চূড়ায় নিয়ে যায়। চলচিত্রে “বিদায় দাও গো বন্ধু তোমরা’, এবার দাও বিদায়’ শিরোনামের একটি গানে আবদুল জব্বার গেয়েছিলেন ‘এই বুঝেছি সার, মিছে এ সংসার/ হেথা আপন বলে মানতে পারি, এমন কেহ নাইরে, এমন কেহ নাই’। এই গানটি যখন শুনি আমি নিজের আবেগ সংবরণ করতে পারি না। এভাবেই বেঁচে আছেন কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বার। কোটি বাঙালির হৃদয়ে। বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।

বাংলাদেশে আধুনিক গানের একটি স্বর্ণযুগ ছিল। সেই স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রধান কণ্ঠ ছিলেন আবদুল জব্বার। আধুনিক গানের রোমান্টিক ও বিরহের ধারার তিনি ছিলেন প্রধান পুরুষ। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পূর্বে আকাশবাণী কলকাতা ও গ্রামোফোন রেকর্ডকেন্দ্রিক ধারাটি সজীব ছিল। ১৯৪৭ পরবর্তী ঢাকা বেতার কেন্দ্রিক আধুনিক গানের ধারাটি ছিল দুর্বল ও সম্পূর্ণ নতুন। এসময় আনিসুল হক চৌধুরী, ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, কলকাতা থেকে আসা কবি আজিজুর রহমান যুক্ত হলেন গান রচনায়। সুরকার ছিলেন আবু বকর, কাদের জামেরী, আবদুল আহাদ প্রমুখ। এসময়  কুষ্টিয়ার কণ্ঠশিল্পী আবু বকর ও খালিদ হোসেন ছিলেন নতুন শিল্পী। আরো যারা গান কণ্ঠে তুলতেন তারা হলেন, আনোয়ার উদ্দিন খান, ফেরদৌসী রহমান, ইসমত আরা, লায়লা আরজুমান্দ বানু, আনজুমান আরা বেগম প্রমুখ। রাজশাহী ও রংপুর বেতার প্রতিষ্ঠিত হলে বেতার কর্মকর্তা নাজমুল আলম কুষ্টিয়া সফরে যান। সেখানে এক অনুষ্ঠানে আবিষ্কার করেন বিড়ি শ্রমিক সুকণ্ঠ আবদুল জব্বারকে। নাজমুল আলমের আগ্রহে আবদুল জব্বার ঢাকা বেতারের শিল্পী হিসাবে সুযোগ পান। এসময় কলকাতা থেকে আসেন উর্দুভাষী বশির আহমদ, ভারত থেকে আসেন তালাত মাহমুদ। তালাত মাহমুদ ঢাকার চলচিত্রে ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো’ গানটি গেয়ে ঢাকা ত্যাগ করেন। 

ষাটের দশকে ঢাকায় একদল কণ্ঠশিল্পী বেতার ও চলচিত্র উভয় মাধ্যমে গান গাইতে শুরু করেন। এসময় পাকিস্তানি বাঙালি শিল্পী নাহিদ মিয়াজির ‘আকাশের এই মিটি মিটি তারার সাথে কইব কথা’, হাসিনা মুমতাজের ‘তন্দ্রাহারা নয়ন আমার’, আনজুমান আরা বেগমের গাওয়া ‘আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল’ এই চিরসুবজ গানগুলো মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। এসময় এই চিরসবুজ গানগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে ‘এতটুকু আশা’ চলচিত্রে আব্দুল জব্বারের গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’ গানটি জনপ্রিয়তায় সকল শিল্পীর রেকর্ড ছাপিয়ে যায়। গানটি গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে যায়। এ সময় আধুনিক গানের স্রোতে যুক্ত হলেন শক্তিশালী মেলোডি কণ্ঠ সৈয়দ আবদুল হাদি, কণ্ঠশিল্পী মাহমুদুন্নবী, খোন্দকার ফারুক আহমদ, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, বশির আহমদ, আবদুল রউফ ও এমএ হামিদ। এদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আবদুল জব্বার ঢাকায় চলচিত্র ও বেতারে কণ্ঠ দিয়ে চললেন। তাঁর কণ্ঠে সৃষ্টি হলো, ‘তারা ভরা রাতে, তোমার কথা যে মনে পড়ে বেদনায়’ অমর গানটি।

আবদুল জব্বারকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি গাইলেন ‘আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন, কপালের কালো তিল পড়বে চোখে’, ‘একবুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি কেন একা বয়ে বেড়াও’, ‘আমার এই চোখ দুটি আয়না করে তোমার ছবিটি যদি দেখতে’, ‘ভাবনা আমার আহত পাখির মতো’, ‘মনরে ভবের নাট্যশালায় মানুষ চেনা দায়’, ‘আমার আকাশে আজ মেঘ করেছে’, ‘ভালোবাসা যন্ত্রণা হয়’, আমার সে প্রেম আমাকে ফিরিয়ে’, ‘আমি বন্ধু মাতাল নই’, ‘আমি বন্ধুর প্রেমে হইলাম পাগল’, ‘ওগো তন্বী তরুলতা বহ্নি আঁখি বল না তোমায় আমি কী নামে ডাকি’ ইত্যাদি গান। এসব গান তাঁকে অমর করে রাখবে। আবদুল জব্বারের গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’ গানটি ভুবন বিখ্যাত বাংলা গানের তালিকায় স্থান পেয়েছে। শুধু এই গানটি নয়, ‘ওরে নীল দরিয়া’ এবং ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’সহ তাঁর প্রায় সব গান আন্তর্জাতিক মানের।

আবদুল জব্বারের জনপ্রিয় গানের সংখ্যা অসংখ্য। তাঁর অসামান্য অবদান নিয়ে আমাদের ভাবা উচিত। তখনকার সময়ে বাংলা গানের যে চর্চা হয়েছিল তা থেকে শিল্পীরা ব্যক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ হয়েছেন তা নয়। এরথেকে আমাদের দেশ সমৃদ্ধ হয়েছে। আবদুল জব্বার ছিলেন বাংলা গানের অভিভাবক শ্রেণীর একজন। তিনি চলে গেলেন ঠিকই। কিন্তু রেখে গেলেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। হয়তো সেসব গান নিয়ে যুগের পর যুগ মুগ্ধ থাকবে বাঙালি। কিন্তু আবদুল জব্বারের শূন্যস্থান জাতি কীভাবে পূরণ করবে? বস্তুতপক্ষে আবদুল জব্বারের ঘাটতি পূরণ হবার মত নয়। তারপরেও তাঁর ঘাটতি পূরণ করার দায়িত্ব তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের। আবদুল জব্বারের ঘাটতি পূরণ করতে হলে তাঁর আদর্শ লালন করতে হবে। আবদুল জব্বারের আদর্শ ছিল শুধু গান করে নিজের ক্যারিয়ার সমৃদ্ধ করা নয়। তাঁর আদর্শ ছিল বাংলা গানের যেকোন দুর্যোগে এগিয়ে যাওয়া। দেশের যেকোন সঙ্কটে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের পক্ষে কাজ করা। গান করার সময় আবদুল জব্বারের এ আদর্শ চর্চা করলে সেই গান হয়ে উঠবে গণমানুষের। তখনই আবদুল জব্বারের ঘাটতি পূরণ হতে পারে। 

আবদুল জব্বার ছিলেন নির্লোভ। হেসে খেলে আর গান করে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। কোনো অতৃপ্তি রাখেননি মনে। তবে জীবনের শেষ বেলায় অসুস্থ অবস্থায় মনে কিছুটা অভিমান এসেছিল। দেশ আজ অনেক সমৃদ্ধ। যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের পথে পথে গান করে অর্থ সংগ্রহ করেছেন, তাঁর জীবনের শেষ বেলায় অসুস্থতার সময় অর্থের অভাব তাঁকে তাড়না করেছিল। তবুও তিনি দ্বিধাহীনভাবে নিষেধ করেছিলেন কেউ যেন তাঁকে করুণা না করে। আবদুল জব্বার স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশ। পরাধীনতার শিকল ছিড়ে দেশ পেয়েছে লাল সবুজের পতাকা। এরপর আবদুল জব্বার গেয়ে গেছেন একেকটা বিশুদ্ধ বাংলা গান। তিনি বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বাংলা গানের এক স্বতন্ত্র অধ্যায়। 

বাংলা গানের ইতিহাস থেকে আবদুল জব্বারকে কোনোভাবেই আড়াল করা যাবে না। তবুও আমাদের দায়িত্ব তাঁর নাম ও সৃষ্টি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে জানিয়ে যাওয়া। বর্তমান সময়ে গান হচ্ছে আগের তুলনায় বেশি। এখন গান তৈরির আয়োজন ব্যাপক এবং বাজেটও বিশাল। অথচ বর্তমান সময়ের গান মানুষের হৃদয়ে দোলা দিতে পারছে না। বর্তমানে গান যেন বলছে না মাটি ও মানুষের কথা। প্রেম-ভালবাসার গানেও নেই আগের আবেগ, ফলে বর্তমানে গান তৈরি হচ্ছে আর গানগুলো উধাও হয়ে যাচ্ছে। তাই এই গানের ক্রান্তিকালে এখন প্রজন্মকে জানানো উচিত আবদুল জব্বাররা কীভাবে গান করেছেন। একটা গানের জন্য কত গবেষণা ছিল। কত প্রস্তুতি ছিল। 

আবদুল জব্বারের গান নিয়ে আলোচনার সময় একটা বিষয় উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, তাঁর গানের অপব্যবহার। তাঁর গান হয়তোবা রিমেক করার জন্য অনুমতি পাওয়া গেছে। কিন্তু যারা মঞ্চে উঠে ‘ওরে নীল দরিয়া’, ‘তারা ভরা রাতে, তোমার কথা যে মনে পড়ে বেদনায়’ গানগুলো গেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করছেন, তারা গান গাওয়ার আগে আবদুল জব্বারের নামটি উচ্চারণ করছে কি না? আমাদের এই অভ্যাস গড়ে ওঠা খুব জরুরি।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের এই কণ্ঠযোদ্ধা ২০১৭ সালে ৩০ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেছেন। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান আবদুল জব্বারের কীর্তি তথ্যচিত্র করে ধারণ করে রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে। এটি বাঙালি জাতির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকবে। আগামী প্রজন্মকে জানাতে হবে আমাদের গৌরবময় অতীত। সরকার এদিকে শুভদৃষ্টি দিক সেটাই আবেদন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কোনো শিল্পীর অবদান কম নয়। তারপরেও বলব পাঁচ দশকের বেশি সময় বাংলাদেশের গানের ভুবনে আলো ছড়ানো দরাজ কণ্ঠের শিল্পী আবদুল জব্বার দেশের জন্য ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। দেশপ্রেমিক কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বারের চলে যাওয়া বড়ই বেদনার। মেনে নেওয়ার মতো নয়। কেননা আবদুল জব্বারের প্রয়াণ বাঙালি জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। 

আবদুল জব্বারের প্রথম মৌলিক গানের অ্যালবাম ‘কোথায় আমার নীল দরিয়া’ প্রকাশিত হয় জীবনের শেষ বেলায়। ২০১৭ সালে। এই অ্যালবামের কাজ তিনি শুরু করেছিলেন ২০০৮ সালে। সংগীতে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ১৯৮০ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৫ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলার শ্রোতা জড়িপে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় তাঁর গাওয়া তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ ও ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গান তিনটি স্থান পায়। আবদুল জব্বার চলে গেলেও তাঁর গান বাঙালির হৃদয়ে থাকবে চিরদিন, চির অম্লান হয়ে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ও/ডব্লিউইউ