টিনেজ ও বাচ্চাদের দুর্দশা নিয়ে বাবা-মায়ের ভাবনা জরুরি

লুলু আম্মানসুরা : আমাদের দেশের বাবা-মা/ অভিভাবকেরা কি তাদের প্রিয় সন্তানের মনের খোঁজখবর রাখতে আদৌ আগ্রহী? শ্রদ্ধেয় মা, আপনি আপনার ছেলের/মেয়ের মুখ দেখে তার পেটের ক্ষুধা ও শরীরের অসুস্থতা যতটা টের পান, মনকে টের পান কি? অথচ বাচ্চার সুন্দর ভবিষ্যৎ নিষ্কণ্টক করতে তার মনের সুস্থতা খুবই জরুরি অথচ আমরা সেদিকে একেবারেই বেখেয়াল।

আমাদের দেশের বাচ্চারা বড় হয় খুবই নিরানন্দময় পরিবেশে। তিন চার বছর বয়স হলেই তার ঘাড়ে সিন্দাবাদের ভূতের মতন বই খাতার বোঝা যে চেপে বসে তা আর নামেনা বরং দিন দিন ভারী হয় ও জেকে বসে। একগাদা বই নিয়ে স্কুল, কোচিং, আরবি হুজুর, নাচ-গানের শিক্ষক ইত্যাদি নির্মিত জেলখানাতেই বন্দী থাকে তার দুরন্ত শৈশব ও কৈশোর।

একটু চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন, একটা টিনেজ বাচ্চা একগাদা বই খাতা বোঝাই করে সকালে স্কুল/কলেজে যাচ্ছে, সেখানে চার পাঁচ ঘন্টা একনাগাড়ে বসে থেকে থেকে শুধু স্যার-ম্যাডামদের রসকষহীন তথ্য-উপাত্ত এবং থিওরেটিকাল জ্ঞান গ্রহণ করে। স্কুল/কলেজ শেষে দৌড় দিচ্ছে বিভিন্ন প্রাইভেট কোচিং-এ। সেখানেও সেই একই ব্যাপার, ক্লাসটাই সীমিত পরিসরে উপস্থিত। এভাবে চার-পাঁচটা কোচিং করে দৈনিক আট দশ ঘণ্টা জ্ঞান অর্জনের নিরামিষ প্রক্রিয়ার সাথে কাটিয়ে বাচ্চাটি বিধ্বস্ত হয়ে যখন বাসায় প্রবেশ করে তখন সেই বাচ্চা ও তার পরিবার ভাবে- এই আট দশ ঘণ্টা ও শুধু কিভাবে ও কতটুকু পড়তে হবে তা জেনেছে, আসল পড়ালেখার সময় ত এখন!

ভাবা যায়! কত বড় মানসিক অত্যাচার!

দিন রাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আট ঘণ্টার ঘুম ও আট ঘণ্টা কলেজ-কোচিং করে বাচ্চাটার হাতে সময় থাকে কয় ঘণ্টা? আট ঘণ্টা! এই আট ঘণ্টার মধ্যে তার খাওয়া, গোসল ও টয়লেট বাবদ সময় লাগে মিনিমাম দুই ঘণ্টা। যেহেতু কলেজ ও কোচিং তাকে শুধু পড়াটা বুঝিয়ে দিয়েছে কিন্তু শিখিয়ে দেয়নি তাই সেই পড়াটা শিখতে, রপ্ত করতে এবং ‘পাঁচ-দশ কেজি হোমওয়ার্ক’ করতে বাচ্চাটার সময় লাগে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা। এবার ভাবুন, তার ২৪ ঘণ্টার বাকি পাঁচ ছয়-ঘণ্টাও যদি তাকে পড়েই কাটাতে হয় তাহলে সে নিজের জীবন যাপন করবে কখন? তার দুরন্ত শৈশব ও কৈশোরের আবেগগুলোকে মিটাবে কিভাবে? তার মন বিনোদন-চাহিদা পূরণ হবে কিভাবে? সে নিজের দিকে তাকাবে কিভাবে?

একারণেই টিনেজ বাচ্চারা বাধ্য হয়েই প্রেম করে। কেননা নিরানন্দময় পড়ুয়া জীবনে তার একমাত্র আনন্দ উৎস কেবল প্রেমের সময়টুকু। পড়তে পড়তে বিধ্বস্ত ও ক্লান্ত মনে আনন্দের মলম বুলিয়ে দেয় কেবল প্রেমের সময়টুকু। এখানেই সে তার বন্ধুত্ব, জৈবিকতার উদ্দাম বুনো আনন্দ, বয়সের দুরন্তপনা খুঁজে পায় এবং তার উপর চাপিয়ে দেয়া বইয়ের বোঝার বিরুদ্ধে প্রতিবাদকেও বুঝে পায়। এটুকুকেই কেবল তার নিজের জন্য কিছু করা বলে মনে করে।

যেহেতু একটা ব্যাপারের উপরেই সে তার সমগ্র দেহ মনের ভর দেয় তাই এই ব্যাপারটা ভঙ্গুর হয় এবং এখানে ভুলও হয় বেশি। যেহেতু অভিভাবকেরা এই ভুলকে পাপজ্ঞান করে তাই বাচ্চাটা নিজেকে নির্ভুল বানাবার চিন্তা মাথায় আনার আগেই নিজেকে পাপী মনে করে ও আত্মসম্মানবোধ কমিয়ে ফেলে সত্যিই সত্যিই অনেকে পাপী হয়ে যায়। যারা হয়না, তারা যে কেন ও কিভাবে হয়না এবং কিভাবে এত মানসিক শক্তি জিইয়ে রাখে তা কেবল তারা ও তাদের আল্লাহ জানে।
তাহলে বাবা মায়ের করণীয় কী? আমরা কি বাচ্চাদের পড়াবো না?

অবশ্যই পড়াবো তবে কয়েকটা ব্যাপারে পরিবর্তন আনতেই হবে যদি বাচ্চাদের সুন্দর ও সবল জীবন চান। এক্ষেত্রে আমাদের করণীয়:

* শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতির উপর সরকার যেন সুনজর দেয় সেই বিষয়ে সরকারকে চাপ সৃষ্টি করা।

* বাচ্চাদের জীবনে বিনোদনের সুস্থ উৎস রাখা, যেমন- বাগান করা, বেড়াতে যাওয়া, খেলা, পারিবারিক আড্ডায় বাচ্চার অংশগ্রহণ রাখা, গল্পের বই পড়া ইত্যাদি।

* সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, যেন ওর জীবনের প্রেম ও কামজনিত ঘটনা ও দুর্ঘটনায় ও ক্লাস বা পাড়ার বখাটে ছেলে মেয়ের কাছে আশ্রয় না খুঁজে আপনার বুকে আশ্রয় খুঁজে নিতে পারে। ফলে দুর্বল সময়ে বাজে ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে এবং পিতামাতার সুপরিকল্পিত হস্তক্ষেপে ক্ষতির পরিমাণ কমবে।

* পড়ালেখা পড়ালেখা করে বাচ্চার জীবন বিষিয়ে না দেয়া। সবার ত আইনস্টাইন হতে হবে এমন কোন কথা নেই।

এবং সর্বশেষ কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, নিজেকে যোগ্য বাবা-মা হিসাবে গড়ে তুলতে না পারলে বিয়ে না করা। শুনতে হাস্যকর লাগলেও এটা আমার দেখা পরীক্ষিত সত্য, শুধুমাত্র ব্যাড প্যারেন্টিংয়ের জন্য অনেক সুন্দর বাচ্চার জীবন কুৎসিত হয়ে যায়।

এসএ/