বছরে রেলের শত কোটি টাকার তেল চুরি

Published: Sat, 28 Nov 2020 | Updated: Sat, 28 Nov 2020

অভিযাত্রা ডেস্ক : বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি অসাধু চক্র প্রতি বছর চুরি করে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকার তেল। রেলওয়ের দুই অঞ্চলেই (পূর্ব-পশ্চিম) বছরে প্রায় শত কোটি টাকার তেল চুরি হচ্ছে। আর তেল চুরির সাথে স্টেশন মাস্টার, ডিপো ইনচার্জ, গার্ড, ট্রেনচালক ছাড়াও সক্রিয় একাধিক সিন্ডিকেট জড়িত।

মাঝে-মধ্যে তেল চুরির ঘটনায় কেউ কেউ ধরা পড়লেও জামিনে বেরিয়ে তারা আবারো চুরিতে সক্রিয় হচ্ছে। রেলওয়ের লোকোশেড ছাড়াও পাওয়ার কার, ডিপো ও ট্রেন ইঞ্জিন থেকে তেল চুরির ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চল মিলে ২৪ ঘণ্টায় দেশের চারটি সেকশনে ৩ শতাধিক এক্সপ্রেস, মেইল, লোকাল ও মালবাহী ট্রেন চলাচল করে। বর্তমানে ৪৪টি জেলায় বর্তমানে ওসব ট্রেন চলাচল করে আর দেশে ২ হাজার ৯৫৬ কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। ওসব ট্রেন চলাচলে ২৪ ঘণ্টায় গড়ে তেলের প্রয়োজন হয় ১ লাখ ৮৩ হাজার লিটার। ওই হিসাবে বছরে ৬ কোটি ৬৪ লাখ ৩০ হাজার লিটার তেল লাগে। রেলওয়ে নিরাপত্তা বিভাগের আনুমানিক হিসাবে সারা দেশের রেলপথে দৈনিক গড়ে ৪৫ হাজার লিটার তেল পাচার ও চুরি হয়। আর বছরে যে পরিমাণ তেল পাচার হয় তার দাম ১০০ কোটি টাকারও বেশি।

সূত্র জানায়, রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি তেল চুরি ও পাচার হয় পাকশী বিভাগের আবদুলপুর, ঈশ্বরদী, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, আমনুরা, হাতীবান্ধা, পার্বতীপুর, সৈয়দপুর, ললিতনগর, সান্তাহার, কাউনিয়া, চাটমোহর, বালাসী রেল ডিপো, পোড়াদহ, কালুখালী, দৌলতদিয়া, নওয়াপাড়া, রহনপুর, দর্শনা ও নাটোর স্টেশনে।

পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের ১৯২ ট্রেনের মধ্যে ১৮৩টিতেই তেল চুরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া দুই অঞ্চলের মালবাহী ট্রেন থেকেও তেল চুরির ঘটনা ঘটছে। পশ্চিমাঞ্চলে ঈশ্বরদী বাইপাসে বনলতা ট্রেনের স্টপেজ না থাকলেও চালক ও গার্ডরা সেখানে ট্রেন থামিয়ে তেল পাচারের সুযোগ করে দেয়।

বিগত ২৯ আগস্ট সকালে লালমনিরহাট রেলওয়ে ডিভিশনের মহেন্দ্রনগর রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকায় রেলওয়ের তিন কর্মচারী চোরচক্রের একজনের যোগসাজশে চলন্ত ট্রেন ২০ ডাউন-এর সংযুক্ত বগি স্টোরভ্যান থেকে মবিলভর্তি তিনটি ড্রাম ও ডিজেলভর্তি দুটি জ্যারিকেন নিচে ফেলে দিয়ে চলে যায়। পরে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী ওই ট্রেন থেকে ফেলে দেয়া তিনটি ড্রামভর্তি ৬২৪ লিটার মবিল ও দুটি জ্যারিকেনভর্তি ৩০ লিটার ডিজেল উদ্ধার করে। ওই সময় মবিল চোর সিন্ডিকেটের দুই সদস্যকেও আটক করা হয়। কিন্তু তার কিছুক্ষণের মধ্যে তেল চোর সিন্ডিকেটের সদস্যরা রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ৪ সদস্যের ওপর হামলা চালিয়ে আটক ২ জনকে ছিনিয়ে নেয়।

বিগত ১৭ মে রেলওয়ের লোকোমোটিভ থেকে ওঠানো ৬৪৪ লিটার তেল নির্ধারিত পিডব্লিউআই অফিসে না নিয়ে অন্যত্র বিক্রি করার সময় রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তারা রেলওয়ে শ্রমিক লীগ ঈশ্বরদী শাখার সাংগঠনিক সম্পাদককে আটক করে। ওই ব্যক্তি রেলওয়ে পাকশী বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ অফিসের অধীনে ওয়েম্যান হিসেবে কাজ করে। ঈশ্বরদীর কদমতলা এলাকায় একটি দোকানে তেল বিক্রি করার সময় তাকে আটক করা হয়।

তাছাড়া বিগত ২৩ এপ্রিল দুপুরে রাজশাহী রেলস্টেশনে চোরাই তেল ট্যাংকারে ভরার সময় আরএনবি ৫ হাজার লিটার তেলের সঙ্গে রেলের ডিপো ইনচার্জ উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবুলসহ ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা সবাই জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার চাকরিতে পুনর্বহাল হয়েছে। 

সূত্র আরো জানায়, গত ২১ অক্টোবর বিকাল ৫টায় ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশনে বিরতিহীন বনলতা এক্সপ্রেস থামিয়ে পাওয়ার কার থেকে তেল পাচারের সময় ১২০ লিটার তেলসহ আবদুল হাকিম নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আরএনবি। গ্রেপ্তারকৃত আবদুল হাকিম আগেও তিনবার তেলসহ গ্রেপ্তার হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে ঈশ্বরদী আরএনবি ফাঁড়িতে মামলা হয়েছে। মূলত ট্রেনে দায়িত্বরত কেউ সেই সুযোগ না করে দেয় তাহলে বনলতা এক্সপ্রেসের মতো অভিজাত ট্রেনের সুরক্ষিত পাওয়ার কারে চোর ঢুকে তেল চুরি করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কোনো কোনো ট্রেনে আপ-ডাউনে ৫ হাজার লিটার তেলের দরকার হয়। কিন্তু ডিপোকে ম্যানেজ করে পাওয়ার কার বা ইঞ্জিনে আরো ১ হাজার লিটার অতিরিক্ত তেল নেয়া হয়। অতিরিক্ত তেল পথে পাচার করে দেয়া হয়। এভাবে রেল থেকে বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বেশিও তেল পাচার ও চুরি হয়ে যাচ্ছে। 

এদিকে এ প্রসঙ্গে পশ্চিম রেলের মহাব্যবস্থাপক মিহির কান্তি গুহ জানান, রেলের তেল পাচার ঠেকাতে ইতিমধ্যে পশ্চিম রেল বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। আরএনবি এখন অনেক বেশি সক্রিয়। তারা প্রায়ই অভিযান চালায়।

ও/এসএ/