নকশাবহির্ভূত ভবনে সয়লাব ঢাকা, খতিয়েও দেখে না রাজউক

Published: Mon, 13 Jan 2020 | Updated: Mon, 13 Jan 2020

অভিযাত্রা ডেস্ক : রাজধানীতে অহরহ গড়ে উঠছে নকশাবহির্ভূত ভবন। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডের (বিএনবিসি) তোয়াক্কা না করে ভবন নির্মিত হলেও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সেদিকে তেমন নজর নেই। এমনকি সংস্থাটির হাতে রাজধানীতে নকশাবহির্ভূত কী পরিমাণ ভবন রয়েছে তারও কোনো পরিসংখ্যান নেই। বরং অভিযোগ রয়েছে, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ছাড়পত্র নেয়ার ক্ষেত্রে ইমারত মালিক ও নির্মাতাদের নিরুৎসাহিত করেন রাজউকেরই একশ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারী। অনেক ক্ষেত্রে ইমারত মালিক ও নির্মাতারাও জানে না তারা যেসব ছাড়পত্র পাচ্ছে তা ভুয়া। অসাধু কর্মকর্তারা অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ওসব ভুয়া নকশা অনুমোদন করিয়ে দেয়। তাছাড়া অনেক আবাসন প্রতিষ্ঠান আবার অনুমোদনের অতিরিক্ত উচ্চতার ভবনও তৈরি করছে। ওসব অভিযোগে রাজউকের বেশকিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, নিয়ম-কানুন না মেনে গড়ে ওঠা রাজধানীর ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান সরকারের কোনো সংস্থার কাছেই নেই। তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় অঞ্চলভিত্তিক সমীক্ষার তথ্যানুযায়ী প্রায় ৭০ হাজার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে রাজধানীতে বহুতল ভবনের ৯০ শতাংশ ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে। তবে সেজন্য ভবন নির্মাণ বিধিমালা প্রয়োগ খুবই জরুরি। বর্তমানে যে হাজার হাজার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রাজধানীতে রয়েছে তা নিরূপণ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া না হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে।

সূত্র জানায়, ঢাকার বনানীর এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর ভবনটির নকশা অনুমোদনে বিধি লঙ্ঘন এবং নির্মাণে ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য রাজউকের ৬২ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধ ব্যবস্থা নেয়ার কথা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল। তার পরই রাজউক ত্রুটি-বিচ্যুতি অনুসন্ধানে রাজধানীতে নির্মিত বহুতল ভবনগুলো পরিদর্শনের উদ্যোগ নেয়। তবে ১ হাজার ৮১৮টি ভবন পরিদর্শনের পর ওই উদ্যোগ থেমে যায়। গত নভেম্বরের পর থেকে রাজউকের ভ্রাম্যমাণ আদালত আর কোনো অভিযান পরিচালনা করেনি। ফলে কার্যক্রমটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। ফলে রাজধানীতে ঠিক কতগুলো ভবন অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে নির্মিত, সে বিষয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি রাজউক। যদিও রাজউকের ২৪টি দল ১ হাজার ৮১৮টি ভবন পরিদর্শনের পর ১ হাজার ৪৭টি ভবনে বিভিন্ন ধরনের ব্যত্যয় খুঁজে যায়। তাছাড়া অনুমোদিত নকশা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন ৪৭৮টি ভবনের মালিক। তারপর পরিদর্শনে নির্মাণ ত্রুটি পাওয়া ভবন মালিকদের নোটিশ দেয় রাজউক। কিন্তু নোটিস পাওয়ার পর ভবন মালিকরা কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে সে বিষয়ে কোনো তদারকি সংস্থাটি পরিচালনা করেনি।

সূত্র আরো জানায়, বিগত ২০০৮ সালের ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী ইমারত আংশিক বা সম্পূর্ণ নির্মাণকাজ শেষ করার পর তা ব্যবহার বা বসবাসের জন্য সনদ নিতে হয়। ওই সনদ পাওয়ার আগে ইমারত আংশিক বা সম্পূর্ণ কোনো অবস্থাতেই ব্যবহার করা যায় না। ব্যবহার বা বসবাস-সনদের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। ওই সময়ের পর সেটি বাধ্যতামূলকভাবে নবায়ন করতে হয়। অথচ ইতিমধ্যে আইন চালুর ১০ বছর পেরিয়ে গেছে। ওই ১০ বছরে রাজধানীতে ৪০ হাজারের বেশি ভবন নির্মাণ হয়েছে। অথচ রাজউক থেকে এ ধরনের সনদ নেয়া ভবন নির্মাতার সংখ্যা খুবই কম। এমন পরিস্থিতিতে অনুমোদনের বাইরে গিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণের ফলে নকশার সঙ্গে গড়ে ওঠা ওসব ভবনের মিল নেই। আবার অনেক ভবনের পরিপূর্ণ নকশাও নেই। ওসব ভবনে আগুন লাগলে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ থাকে। তখন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের নকশা না দেখেই অন্ধকারে উদ্ধারকাজ চালাতে হয়। ওই কারণে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ে। নির্মাণ শেষে ব্যবহার সনদ না নেয়া হলেও ওসব ভবন মালিকের বিরুদ্ধে এ যাবত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

এদিকে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক আদিল মুহাম্মদ খান জানান, রাজউকের প্রধান কাজ রাজধানীতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প তদারকি করা। কিন্তু তা না করে সংস্থাটি নিজেই বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প করতে বেশি আগ্রহী।

গত বছর রাজউকেরই করা এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল রাজধানীতে ৭০-৭৮ ভাগ ভবন ত্রুটিপূর্ণভাবে গড়ে উঠেছে। ওই প্রতিবেদনে তারা তাদের গাফিলতির কথা স্বীকারও করে নিয়েছিল। সেক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতার চেয়ে আন্তরিকতার ঘাটতি প্রকট হয়ে উঠেছে। গত কয়েক বছরে রাজউকের জনবলও বেড়েছে। অথচ সংস্থাটির আন্তরিকভাবে কাজ না করার কারণে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প রাজধানীবাসীর জন্য নতুন ভোগান্তি সৃষ্টি করছে।

অন্যদিকে এ বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম জানান, সব ভবনের পরিদর্শন কার্যক্রম চলছে। রাজউকের আওতাধীন এলাকার মধ্যে রয়েছে গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জ। সায়েদাবাদের কিছু এলাকা রাজউকের ভেতরে। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ পরিকল্পনা দিয়ে রেখেছে। অনেকেই তা জানতো না। বিভিন্ন এলাকার সরু গলিও এ পরিদর্শন কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত। সামগ্রিকভাবে সর্বত্র ত্রুটি শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কঠোরভাবে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কাউকেই এক্ষেত্রে আলাদা কোনো অনুকম্পা দেখানোর সুযোগ নেই।

এসএ/