আরো শক্তিশালী ‘বুলবুল’, মোংলা-পায়রায় ৭ নং সংকেত জারি

অভিযাত্রা ডেস্ক : বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ঘণ্টায় সোয়াশ কিলোমিটার বেগের বাতাসের শক্তি নিয়ে ধেয়ে আসছে উপকূলের দিকে, আপাতত এর গতিমুখ সুন্দরবনের দিকে। ঘূর্ণিঝড়টি বাংলাদেশ উপকূলের ৫০০ কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে যাওয়ায় মোংলা ও পায়রায় ৭ নম্বর এবং চট্টগ্রাম বন্দরে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত জারি হয়েছে।

পাশাপাশি কক্সবাজারে আগের মতই ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

আবহাওয়াবিদ আবদুর রহমান বলছেন, ‘শনিবার (৯ নভেম্বর) বিকালের পর বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ের প্রভাব অনুভূত হতে পারে। মধ্যরাতে খুলনা অঞ্চল দিয়ে বুলবুল উপকূল অতিক্রম করতে পারে।’

বুলবুল আরো শক্তি সঞ্চয় করে গতকাল শুক্রবার সকালে অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার পর সংকেত বাড়িয়ে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সাগর উত্তাল হয়ে ওঠায় বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

শুক্রবার (৮ নভেম্বর) সকাল থেকেই দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ অধিকাংশ এলাকায় বিরাজ করছে মেঘলা আবহাওয়া, কোথাও কোথাও গুঁড়ি গুঁড়ির বৃষ্টিও হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গর ও জেটিতে দুপুর পর্যন্ত পণ্য খোলাস কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলেও সংকেত বাড়লে নিরাপত্তার স্বার্থে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে বন্দর সচিব ওমর ফারুক জানিয়েছেন।

শুক্রবার বেলা ১২টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৬৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৬৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৫৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল এ ঝড়।

বাংলাদেশের আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তবে ভারতের আবহাওয়া অফিস সকাল সাড়ে ৮টার বুলেটিনে বলেছে, তখন বাতাসের একটানা গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১২০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। সুদূর প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট উষ্ণমণ্ডলীয় ঝড় মাতমো গত অক্টোবরের শেষে ভিয়েতনাম হয়ে স্থলভাগে উঠে আসে। সেই ঘূর্ণিবায়ুর অবশিষ্টাংশই ইন্দোনেশিয়া পেরিয়ে ভারত মহাসাগরে এসে আবার নিম্নচাপের রূপ নেয়। বার বার দিক বদলে নিম্নচাপটি আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগরে এসে বুধবার রাতে তা ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেয়। তখন এর নাম দেওয়া হয় বুলবুল। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাগর তীরের আট দেশের আবহাওয়া দপ্তরের নির্ধারিত তালিকা থেকে ধারাবাহিকভাবে এই অঞ্চলের ঝড়ের নাম দেওয়া হয়। বুলবুল নামটি নেওয়া হচ্ছে পাকিস্তানের প্রস্তাবিত নামের তালিকা থেকে।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বুলবুলের প্রভাবে বৃষ্টি ঝরবে ভারতের ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায়। তবে উপকূলে আঘাত হানার আগে কিছুটা কমে আসতে পারে এ ঝড়ের শক্তি। ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়েছে, পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল শুক্রবার মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত মোটামুটি ঘণ্টায় ১২ কিলোমিটার গতিতে এগিয়েছে। শুক্রবার মধ্যরাত পর্যন্ত এ ঝড় শক্তি সঞ্চয় করতে থাকবে। এরপর সামান্য বাঁক নিয়ে উত্তরমুখী হয়ে এগোবে শনিবার সকাল পর্যন্ত। তারপর আরও বাঁক নিয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে রোববার প্রথম প্রহরে পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপ আর বাংলাদেশের খেপুপাড়ার মাঝ দিয়ে সুন্দরবন অঞ্চল হয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে। তখন ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাছে বাতাসের একটানা গতিবেগ হতে পারে ১১০ থেকে ১২০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১৩৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। জয়েন্ট টাইফুন ওয়ার্নিং সেন্টারের বুলেটিনেও মোটামুটি একই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

বাগেরহাটে কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল : বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে। এই ঘূর্ণিঝড়ের কারণে মোংলা সমুদ্র বন্দরে চার নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেত জারি করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় সংক্রান্ত পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুক্রবার সকালে বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির এক জরুরি সভা করে জেলার সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

এদিকে মোংলা বন্দরে তিনটি কন্ট্রোল রুম চালু করেছে কর্তৃপক্ষ। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদের সভাপতিত্বে এই সভায় পুলিশ সুপার পংকজ চন্দ্র রায়, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. কামরুল ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারাসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভা শেষে জেলা প্রশাসক জানান, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবিলায় জেলার সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলায় ২৩৪টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া জেলা সদরসহ প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ১০টি মেডিক্যাল টিম। রেড ক্রিসেন্ট, ফায়ার সার্ভিস ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কয়েক শত স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার শেখ ফখর উদ্দীন জানান, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় সর্বত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে তিনটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। বন্দর জেটি ও আউটার অ্যাংকরেজে অবস্থানরত ১৪টি জাহাজ নিরাপদে রয়েছে। ঘর্ণিঝড়ের সংকেত ৫ নম্বরে উঠলেই বন্দরের পণ্যবোঝাই ও খালাসের বিষয়ে মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

হারবার মাস্টার কমান্ডার শেখ ফখর উদ্দীন জানান, বন্দরে এই মুহূর্তে মেশিনারি, ক্লিংকার, সার, জিপসাম, পাথর, সিরামিক ও কয়লা বোঝাই দেশি-বিদেশি মোট ১৪টি বাণিজ্যিক জাহাজ অবস্থান করছে। এসব জাহাজে পণ্য খালাসে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মাহমুদুল হাসান জানান, ঘূর্ণিঝড়ের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অবস্থা প্রতিকূল হলে দুবলার চরে জেলেদের মাছ ধরার অনুমতি দেওয়া হবে না। এরইমধ্যে বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে।

সাতক্ষীরায় প্রস্তুত ১৩৭ আশ্রয়কেন্দ্র : ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় এলাকা শ্যামনগর, আশাশুনিতে গতকাল শুক্রবার ভোর থেকেই আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। সেই সঙ্গে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। এ ছাড়া জেলার ১৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া জন্য এলাকায় মাংকিং করা হচ্ছে। একইসঙ্গে উপকূলীয় এলাকার জেলে-বাওয়ালীদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নদীতে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

শুক্রবার বেলা ১১টায় প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. বদিউজ্জামান (সার্বিক) একথা জানিয়েছেন।

সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন বলেন, ‘শুক্রবার ভোর ৬টা থেকে মোংলা সমুদ্র বন্দরের জন্য ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেওয়া হয়েছে। বেলা ১২টার সময় মোংলা থেকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ৫৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছিল। ঘূর্ণিঝড়টি ভারতের উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে।’

এর প্রভাবে শুক্রবার ভোর থেকে সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় এলাকার গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবিলায় সন্ধ্যা ৭ টায় প্রস্তুতিমূলক সভা ডাকা হয়েছে।

নোয়াখালীতে খোলা হয়েছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ : ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ এর প্রভাবে শুক্রবার সকাল থেকে নোয়াখালীতে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। দুপুর ১২টা থেকে বৃষ্টির মাত্রা বেড়েছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় উপকূলীয় উপজেলা হাতিয়া, সুবর্ণচর ও কোম্পানীগঞ্জে সকালে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রত্যেক উপজেলায় খোলা হয়েছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ।

জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস জানান, উপকূলীয় তিন উপজেলায় সকালে জরুরি সভা শেষে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। পরিস্থিতি বুঝে বিকাল নাগাদ উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের সচেতন করার জন্য মাইকিং করা হবে। বিকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক জরুরি সভা আহ্বান করা হয়েছে।

এদিকে, জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোমিনুর রহমান জানান, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুদ রয়েছে। সুবর্ণচর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা এএসএম ইবনুল হাসান ইভেন ও হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নূরে আলম জানান, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নৌযানগুলোকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে বলা হয়েছে।

এসএ/