৫ মাসে এসেছে ২২.৬৬% বেশি রেমিটেন্স

Published: Mon, 02 Dec 2019 | Updated: Mon, 02 Dec 2019

অভিযাত্রা ডেস্ক : প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। সদ্য সমাপ্ত নভেম্বর মাসে ১৫৫ কোটি ৫২ লাখ (১.৫৫ বিলিয়ন) ডলারের রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন তারা।এই অঙ্ক গত বছরের নভেম্বরের চেয়ে ৩১ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি। আর চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) রেমিটেন্স এসেছে ৭৭১ কোটি (৭.৭১ বিলিয়ন) ডলার। যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২২ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি। দুই শতাংশ হারে প্রণোদনা, জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা।

প্রতিবেশি দেশ ভারতসহ অন্যান্য দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমালে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সূচক রেমিটেন্স আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতির গবেষক আহসান এইচ মনসুর। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক ছুটি মিলিয়ে নভেম্বর মাসে কর্মদিবস দিল ১৯ দিন। অক্টোবর মাসে যেখানে ছিল ২৩ দিন।নভেম্বর মাসে কর্মদিবস বেশি থাকলে রেমিটেন্সের পরিমাণ আরও বাড়ত।

বাংলাদেশ ব্যাংক রোববার রেমিটেন্সের হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, চলতি নভেম্বর মাসে ১৫৫ কোটি ৫২ লাখ ২০ হাজার ডলারের রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এ নিয়ে চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) মোট রেমিটেন্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৭০ কোটি ৯৪ লাখ (৭.৭০ বিলিয়ন) ডলার। গত বছরের নভেম্বর মাসে রেমিটেন্স এসেছিল ১১৮ কোটি ডলার। আর জুলাই-নভেম্বর সময়ে এসেছিল ৬২৮ কোটি ৮২ লাখ ডলার।

এ হিসাবেই গত বছরের নভেম্বরের চেয়ে এই নভেম্বর রেমিটেন্স প্রবাহ বেড়েছে ৩১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। আর জুলাই-নভেম্বর সময়ে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২২ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। অক্টোবর মাসে ১৬৪ কোটি ডলারের রেমিটেন্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।যা ছিল এক মাসের হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিটেন্স।

তার আগে সেপ্টেম্বরে পাঠিয়েছিলেন ১৪৬ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে এসেছিল ১৫৯ কোটি ৭৭ লাখ ডলার।অগাস্টে আসে ১৪৪ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স প্রবাহে সুখবর দিয়ে শেষ হয় ২০১৮-১৯ অর্থবছর। গত অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি রেমিটেন্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। তার আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রেমিটেন্সে প্রবৃদ্ধি ছিল আরও বেশি; ১৭ দশমিক ৩২ শতাংশ। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।প্রবাসীরা এখন ১০০ টাকা দেশে পাঠালে যার নামে টাকা পাঠাচ্ছেন তিনি ঔ ১০০ টাকার সঙ্গে ২ টাকা যোগ করে ১০২ টাকা তুলতে পারছেন। বাজেটে এজন্য ৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ-সংক্রান্ত একটি নীতিমালা ঘোষণা করেছে। ৬ অগাস্ট তা প্রকাশ করা হয়েছে; তাতে বলা হয়েছে, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সে প্রণোদনা পেতে ১ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত কোন ধরনের কাগজপত্র লাগবে না। তবে রেমিটেন্সের পরিমাণ এই অংকের বেশি হলে প্রাপককে প্রেরকের পাসপোর্টের কপি এবং বিদেশী নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপত্র অবশ্যই জমা দিতে হবে। আর ব্যবসায়ী ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবসার লাইসেন্সের কপি দাখিল করতে হবে।

গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এক হাজার ৬৪১ কোটি ৯৬ লাখ (১৬.৪২ বিলিয়ন) ডলারের রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এসেছিল এক হাজার ৪৯৮ কোটি ১৭ লাখ (১৪.৯৮ বিলিয়ন) ডলার। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হল বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ বা রেমিটেন্স। বর্তমানে এক কোটির বেশি বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। জিডিপিতে তাদের পাঠানো অর্থের অবদান ১২ শতাংশের মত।

অর্থনীতির গবেষক বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর একটি শীর্ষ গণমাধ্যমকে বলেন, একমাত্র রেমিটেন্স ছাড়া অর্থনীতির অন্য সব সূচকের অবস্থা এখন খারাপ। রপ্তানি বাণিজ্যে ধস নেমেছে। রাজস্ব আদায় কমছে। মূল্যস্ফীতি উর্ধ্বমুখী।চাপে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ।আমদানিও কমছে।বিনিয়োগে খরা কাটছে না।ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পাহাড়। শেয়ারবাজারে তো মন্দা লেগেই আছে। সে কারণেই বলা যায়, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সই এখন সচল রেখেছে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা।

রপ্তানি আয় এবং রেমিটেন্স বাড়াতে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কিছুটা কমিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। রোববার আন্তঃব্যাংক লেনদেনে (ব্যাংকগুলোর নিজেদের মধ্যে কেনাবেচা) প্রতি ডলার ৮৪ টাকা ৯০ পয়সায় বিক্রি হয়েছে। তবে ব্যাংকগুলো নগদ ডলার বিক্রি করছে ৮৭ টাকার বেশি দরে। খোলাবাজারে আরও বেশি; এক ডলারের জন্য গুণতে হচ্ছে ৮৭ টাকা ৫০ পয়সা।এক মাসে আগে ৩১ অক্টোবর আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের দর ছিল ৮৪ টাকা ৭০ পয়সা। পাঁচ মাস আগে ৩০ জুন ছিল ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা। এক বছর আগে ২৭ নভেম্বর ছিল ৮৩ টাকা ৯০ পয়সা। ডলারের দাম আরও বাড়ানোর পক্ষপাতি আহসান মনসুর বলেছেন, বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম ৮ থেকে ১০ শতাংশ বাড়াতে হবে।

তিনি মনে করেন,  চীন, ভারত, ভিয়েতনামসহ প্রতিযোগী দেশগুলো তাদের রপ্তানিকারক ও প্রবাসীদের সুবিধা দিতে তাদের মুদ্রার মান কমিয়েছে। ডলার শক্তিশালী করা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। অর্থনীতির স্বার্থেই এটা করতে হবে।

দীর্ঘদিন ডলার-টাকার বিনিময় হার ধরে রাখা ঠিক হয়নি মন্তব্য করে ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসান মনসুর বলেন, অনেক পিছিয়ে গেছি আমরা। আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো বিশ্ববাজার দখল করতে তাদের মুদ্রার মান অনেক কমিয়েছে; আমরা করিনি।

এখন টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বাড়াতে ‘বড় ধরনের অ্যাকশনে’ যাওয়ার পক্ষপাতি তিনি। তার হিসাবে, ডলারের দর এখন ৯৩ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৯১ টাকা ৮০ পয়সা হওয়া উচিৎ। ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসান মনসুর মনে করেন, ডলারের দাম বাড়ালে রপ্তানি আয়ে বিপর্যয় যেমন কেটে যাবে, তেমনি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সও বাড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, গত অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরেও ভালো প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে রেমিটেন্স। জুলাই থেকে ১০০ টাকা রেমিটেন্স পাঠালে ২ টাকা প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। যার ফলে রেমিটেন্স বাড়ছে।

তিনি বলেন, এছাড়া বিশ্ববাজারে জ¦ালানি তেলের দাম বাড়ায় মধ্যপাচ্যের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হয়েছে। সে সব দেশে অবস্থানকারী আমাদের প্রবাসীরা এখন বেশি মজুরি পাচ্ছেন; বেশি অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন।

রেমিটেন্স বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়নও (রিজার্ভ) সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। রোববার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩১ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে রিজার্ভ ৩২ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলারে উঠিছিল। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মেয়াদের ৯৮ কোটি ৭০ লাখ ডলারের আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল। গত কয়েকদিনে তা কিছুটা বেড়েছে। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, ইরান, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ- এই নয়টি দেশ বর্তমানে আকুর সদস্য। এই দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ যে সব পণ্য আমদানি করে তার বিল দুই মাস পর পর আকুর মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়।

এসএ/