সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ : শামসুল আলম

Published: Sat, 03 Oct 2020 | Updated: Sat, 03 Oct 2020

আমি মো. শামসুল আলম ১৯৫৭ সালে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ গ্রামে জন্মগ্রহণ করি। আমার পিতা মো. দেলবার প্রামানিক ছিলেন একজন কৃষক ও মাতা সামেদান বেগম ছিলেন গৃহিণী। পাঁচ ভাই দুই বোনের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। ১৯৭১ সালে আমি সপ্তম শ্রেণীতে পড়াশোনা করতাম। সেই সময় আমার ১৪ বছর। সেই সময়ে অনেক কিছুই বুঝতাম না। কিন্তু যুদ্ধের সময় আমি বিভিন্ন মিছিল/মিটিংয়ে যেতাম। ইয়াকুব, আজিজ, আনসার মোল্লা, শহিদ ওরাও আমার সাথে যেতো। 

আমাদের অবশ্য কেউ যেতে বলতো না, তবু আমরা যেতাম, এ দেখতে যে, তারা মিটিংয়ে কী করে। লতিফ মির্জা, গেদু মিয়া, আমজাদ হোসেন মিলন, সোবাহান এদের নেতৃত্বে বিভিন্ন জায়গায় মিছিল মিটিং হতো এবং তারা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে ছিল। তাড়াশে যে মিলিটারিরা ক্যাম্প করেছে তা মুক্তিবাহিনীরা জানতে পারে। সেই বিষয়ে আলোচনা করে তারা নিজেদের মধ্যে। মুক্তিবাহিনীরা আমাদের গ্রামের মানুষদের যুদ্ধের সময় কীভাবে পরিবারের সবাইকে নিয়ে নিরাপদে থাকতে হবে, এই দিক নির্দেশনা দিতেন মিটিংয়ে। তারা আমাদের তাড়াশে যে মিলিটারি এলে তা সবাইকে বলে দেয়, যে কোনো সময় নওগাঁতে যুদ্ধ হতে পারে। আমাদের নওগাঁতে  লতিফ মির্জার মুক্তিবাহিনী দিয়ে ঘেরাও করে রেখেছিলো পুরা এরিয়াটা। 

পাকিস্তানের সেনা বাহিনীরা তাড়াশে ক্যাম্প করে। নওগাঁতে মুক্তিবাহিনী চারদিকে ঘিরে রেখেছে, তা হয়তো ওরাও কীভাবে যেন জানতে পারে। সেই সময় বিভিন্ন খোঁজ-খবর দিত রাজাকাররা, হয়তো ওরাই দিয়েছিল এ তথ্য। যুদ্ধের সময় পাক বাহিনীদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতো রাজাকাররা। আমাদের নওগাঁর আশে পাশে কয়েকজন রাজাকার ছিল। রাজাকারদের কমান্ডার ছিলেন বেনেবউ গ্রামের জয়নাল। তার সাথে ছিলেন জফর আলী প্রমানিক, আসমত, আফছার, নওগাঁর মছিম, রহমান, বাট্রা গ্রামের মতিন। এদের মধ্যে এখনও রহমান রাজাকার জীবত আছে। 

আর যুদ্ধের পরে রাজাকারদের বিচার করে মুক্তিবাহিনীরা। কে বড় বড় অপরাধ করেছে দেশের বিরুদ্ধে বা বেশি ক্ষতি করেছে সবকিছু চিন্তা-ভাবনা করে রাজাকারদের কমান্ডার জয়নাল আর বাট্রাগ্রামের মতিন বেশি বিরুদ্ধতা করছে প্রমাণ হয়। পরে তাদের দুই জনকে হত্যা করা হয়। রাজাকাররা পাকিস্তানি মিলিটারিদের নওগাঁতে আসার খবর দেয়। মিলিটারিরা একদিন নওগাঁতে আসে। তারা প্রথমে অবস্থান করে নওগাঁ মাজারে।

মাজার সর্ম্পক জানতে চায় পাক বাহিনীরা। তারা রাজাকারদের জিজ্ঞাসা করে এটা কার মাজার। রাজাকাররা উত্তর দেয় এটা বড় এক ওলির মাজার। পাক বাহিনীরা বিভিন্নভাবে মাজার শরীফকে নিয়ে খারাপ মন্তব্য করে। মিলিটারি নওগাঁর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে থাকে। বিভিন্ন বাড়ি-ঘর থেকে গরু-ছাগল রাজাকারদের দিয়ে নিয়ে যায় খাওয়ার জন্য। এইভাবে মিলিটারিরা ঘুরতে ঘুরতে যখনই নওগাঁ উত্তর পাড়া যায়, তখনই মুক্তিযোদ্ধারা তিনটা ফায়ার করে। সেদিন মিলিটারিরা আসে নওগাঁতে আর যুদ্ধ হয় পরদিন ফজরে দিকে। লতিফ মির্জা গেরিলা বাহিনী ও গেদু মিয়ার মুক্তিবাহিনী নিয়ে নওগাঁ এরিয়া ঘিরে রেখেছিল আগেই। 

সেদিন দুপুর পর্যন্ত তুমুল আকারে যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধটাই আমার চোখের সামনে ভাসে। সেই সময় উত্তর পাড়ার ২টা বাড়ি ছিল। তার মধ্যে আমাদের একটা। যুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীরা আমাদের বাড়িতে এসে মিলিটারিদের সাথে যুদ্ধ করে। আর আমদের বাড়ির পাশের ডোবাতে পরিবারে সবাইকে নিয়ে থাকতে বলে। কারণ হলো গুলি করলেও আমাদের মাথার উপর দিয়ে চলে যাবে। এমন সময় যুদ্ধটা শুরু হয়, পালানোর কোনো সময় ছিল না। আমরা সবাই ডোবাতে গিয়ে নিচু হয়ে শুয়ে পড়ি। অবশ্য আমাদেরকে মিটিংয়ে এই সতর্ক করা হয়েছিল আগেই।

সেদিন এত ফায়ার হয় যে, ফায়ারের কারণে গাছের পাতা ছিল না। আর শুধু গুলির খোসা পড়ে ছিল। যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর কাছে পরাজিত হতে থাকে মিলিটারিরা। পাক বাহিনীরা দৌড়ে পালাতে থাকে আর আত্মসমর্পন করে কিছু। তাদেরকে আমরা গ্রামের সবাই ধরতে থাকি, আর লতিফ মির্জার কাছে তুলে দিতে থাকি। 

সেদিনের যুদ্ধতে অনেক পাক সৈন্যরা গ্রামের ঘর-বাড়িতে বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে ছিল। তাদের অনেককে আমরা পরের দিনেও ধরি। কিন্তু যুদ্ধের একদিন পরেই হাজার হাজার মিলিটারি আসতে থাকে নওগাঁতে। পাকবাহিনী আসতেই বিনাদভাটা গ্রামে ধানের ক্ষেতে ৫ জন নিরীহ সাধারণ মানুষকে গুলি করে করে হত্যা করে। হত্যা করে বিনাদভাটা গ্রামের হাসান, মুক্তার, শহকত ও হাসানপুর গ্রামের জেনাদ এবং জফের সরকারকে।

মিলিটারিরা আসে আর গ্রামে আগুন দিতে থাকে। সেদিন যুদ্ধে পাকিস্তানি মিলিটারির বিনাদভাটা, হাসানপুর, নবীপুর, নওগাঁ, কুমরুল, বিনয়নগর, রায়নগর, কেসেদপুর গ্রামে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। শুধু তাই না, ধানক্ষেত পুড়িয়ে দেয়, এমনকী আমাদের বাড়িতে ধানের পালা দেয়া ছিল, সেগুলোও পুড়িয়ে দেয়। মুক্তিবাহিনী এত সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করে পারবে না, কারণ যুদ্ধে গোলা-বারদ শেষ হয়ে গেছে। তাই যুদ্ধ না করে একটু আরাল হয়ে যায়।

আমরা আগেই খোঁজ পাই যে, গ্রামে পাকবাহিনী ঢুকবে। কারণ রাজাকারদের আত্মীয়-স্বজনছিল আমাদের গ্রামে। রাজাকাররা তাদের জানিয়ে দিত। এতে আমরাও জানতে পারতাম। তাই আমি আমার পরিবারের সবার সাথে রাজাকাদের কমান্ডার জয়নালের গ্রাম বেনেবউতে খোরশেদ তালুকদারে বাড়িতে চলে যাই এবং সেইখানে আমার পরিবারকে নিয়ে অবস্থান করি। সেই গ্রামে অনেক মানুষ গিয়েই অবস্থান করে।

৫-৭ দিন পর আমরা গ্রামে ফিরে আসি। এসে দেখি আমাদের কোনো কিছু নেই। আর সাথেও কিছু নিতে পারি নাই। সবার একই অবস্থা। পরে আবার আমরা নতুন করে ছন দিয়ে ঘর তৈরি করি। কিন্তু তখনও দেশ স্বাধীন হয়নি। মিলিটারিরা হান্ডিয়াল ক্যাম্প করে ছিল নওগাঁর যুদ্ধের পরে। আর সাধারণ মানুষদের বিভিন্নভাবে অত্যাচার করত। মা-বোনদের নির্যাতন করাসহ বাড়ি থেকে বিভিন্ন মালামাল লুট করাতো তারা। এগুলো দেখে আমাদের সহ্য হত না। তাই আমরা গ্রামের সমবয়সের ছেলেরা যুদ্ধে যাবার পরিকল্পনা করতে থাকি। 

আমি, খলিল, গোলবার, গোলাম, রফিক, হবি, আজিজসহ আমরা সবাই পরিকল্পনা করলাম, ভারত গিয়ে ট্রেনিং করে এসে দেশে যুদ্ধ করবো। কিন্তু তা আর যাওয়া হলো না। কিছু দিন পরেই বিভিন্ন জায়গায় থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা আসতে থাকে। এদিকে খবর পাই, হান্ডিয়াল পাকবাহিনীরা ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে চলে গেছে। চারদিক থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা আসতে থাকে। কিছু দিন পরেই দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। 

স্বাধীনতার পরে আর পড়াশেনা করা হয় না আমার। পরে আমি কৃষি কাজে যুক্ত হয়ে পড়ি। ১৯৭৬ সালে আমি শাহানাজ বেগমকে বিয়ে করি। আমাদের তিন সন্তান সুমন, মামুন, সাবিনা। আমি বর্তমানে নওগাঁর সেই উত্তরপারা (নবীপুর) গ্রামেই বসবাস করছি।

অনুলেখক : ইমরান হোসাইন

ও/ডব্লিউইউ