সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ: খাদেমুল হোসেন (তারা)

Published: Tue, 24 Nov 2020 | Updated: Tue, 24 Nov 2020

আমি মোঃ খাদেমুল হোসেন (তারা)। ১৯৪৯ সালে সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ গ্রামে জন্মগ্রহণ করি। আমার পিতা: মো: ইমান আলী প্রামানিক। আমার বাবা ছিলেন একজন কৃষক। আমার মা আফছুন নেছা ছিলেন গৃহিনী। আমরা চার ভাই ও এক বোন, আমি প্রথম। আমি ১৯৬৫ সালে আমার স্ত্রী সকিতুন খাতুন কে বিয়ে করি। আমার পাঁচ ছেলে মেয়ে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় আমার পেশা ছিল কৃষি। সে বছর অসহযোগ আন্দোলনের সময় আমি বিভিন্ন মিছিল/মিটিংয়ে যোগ দিতাম।

১৯৭১ সাল। সেদিন ছিল বুধবার দিবাগত রাত। আমি সেহরী খেয়ে শুয়ে আছি। আমার ছোট ভাই আমজাদ আর আমার মেজো চাচা আতাব আলী। এরা মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকার মাঝি ছিলেন। সেদিন হঠাৎ করে হই হই করে নৌকা বেয়ে আসার শব্দ পাওয়া যায়। আমি মনে করেছিলাম পরের দিন হাটের দিন, মোহনপুর থেকে ছন বিক্রির জন্য হয়তো কেউ আসছে। পরে লক্ষ্য করে দেখি, আমার ছোট ভাইয়ের কন্ঠ। আমি মাকে বললাম, ‘ও মা, আমজাদ মনে হয় পালিয়ে আসছে!’ এই দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের কোন খোঁজ-খবর নাই, আর ও আসছে! আসার পরে শুনি যে ও মুক্তিযোদ্ধাদের বাংকারে পৌঁছে দিয়ে খাওয়া দাওয়া করিয়ে তারপর বাড়ি ফিরেছে।

আমজাদকে জিজ্ঞেস  করলাম, ‘কিরে! যুদ্ধর কী পরিস্থিতি?’ তাকে সতর্ক  করে দিয়ে বললাম, ‘তাড়াশে মাঝে মাঝেই  রাজাকাররা আসে, অত্যাচার করে। ওখানে যাবি না’। আমজাদ বলে, ও যাবে। সে বলে, ‘নৌকা নিয়ে আমরা একটু ফাঁকে ছিলাম, এখন তো কাছাকাছি। মনে হয় তাড়াশে রবিবার কিংবা সোমবারে আট্যাক করবে’। বললাম ‘ভাত খা, বড় বাইম ধরেছি’। ও রোজা ছিল না, ভাত খেলো। 

খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমজাদ মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে যাবার জন্য বের হয়। আমাদের বাড়ি থেকে দুই কিংবা তিন বাড়ি যেতেই হিমসাগর ফায়ার হয়। মুক্তিযোদ্ধরা প্রথম গুলি করে মিলিটারিদের। প্রতাব- উল্লাপাড়া দিয়ে মিলিটারি নওগাঁ প্রবেশ করে। ওদের দেখেই হঠাৎ করেই  গুলি এল। তারপরই তো শুরু হয়ে যায় তুমুল আকারে যুদ্ধ। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে আমরা এখন কী করবো, চারদিক দিয়ে শুধু গুলি আর গুলি। বাড়ির সবাইকে নিয়ে পড়লাম মহাবিপদে। পরে কোদাল দিয়ে বাড়ির পাশে লম্বা করে গর্ত করলাম। মা, বউ, ছোট ভাইয়ের বউকে সেই গর্তের মধ্যে রাখলাম। আর ওদের বললাম ‘যে যা জানিস সেই দোয়া কালাম পড়। আজ হয়ত আর বাচঁবো না।’ 

এই যে আরম্ভ হলো, একটানা ১১টা পর্যন্ত শুধু গুলির শব্দ পাওয়া গেল। দুই দিক থেকেই সেই গোলাগুলি হচ্ছে। মা-ঝিদের গর্তে রাখার পর যুদ্ধ চলা অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের বাড়িতে উঠে আসে। আমি ভয়ে কোন কথা বলতে পারছিলাম না তাদের সাথে। পরে মা মুক্তিযোদ্ধাদের বলে, ‘কিরে বাবা! তোরা কি আমাদের মেরে ফেলবি নাকি?’ ওরা বলে, ‘না মা, আমরা আপনাদের বাঁচানোর জন্য এসেছি। আপনারা এই গর্ত ছেড়ে দেন। আমরা এখান থেকে পজিশন নিব’। আমি বললাম ‘ভাই! এদের কী করবো?’ ওরা বলে, ‘ওই যে পুকুরের কাদায় উত্তর সিথানী করে শুইয়ে রাখেন’। কী আর করার, তাই করলাম। কাদার মধ্যে মা-ঝি দের পুকুরে শুইয়ে রাখি। 

সব মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের বাড়িতে চলে আসতে লাগলো। আমাদের বাড়ি থেকেই  পজিশন নিয়ে সেই আকারে গুলি করতে থাকে। সেই সময় জমিতে ধান ছিল। মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধারা  জিজ্ঞেস করল, ‘ওই যে উঁচু জমি দেখা যায়। সেখানে যাবো, যাবার কোন পথ আছে কি?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ আছে’। তারা বললো, ‘তা হলে আমাদের সাথে চলেন’। আমি বললাম ‘আমি কি করে যাবো?’তারা বললো ‘কেন, আমরা যে ভাবে যাই সেই ভাবেই যাবেন’। 

পরে তাদের সাথে আমি বুক কনুই আর হাটুতে ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে গেলামউঁচু জমির নিচে গিয়ে থামলাম, সেখান থেকে গুলি করতে থাকে মুক্তিযোদ্ধরা। তারা আমাকে মাথা তুলতে নিষেধ করে, কারণ মাথা উচু করলেই গুলি লাগবে। প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়। মুক্তিবাহিনী ছিল ধানের আড়ালে আর পাকবাহিনী ছিল রাস্তার উপরে। এতে পাকবাহিনীর অনেকেই মারা যায়।

পরে পাকিস্তানি মিলিটারি আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু বাঙ্গালীরা কি আর তা মানে! ‘জয় বাংলা’ বলতে বলতে এগিয়ে যায় আর গুলি করতে থাকে। মিলিটারি দৌড়ে পালাতে থাকে বগার বিলের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু ওরা তো যানে না বিলে কতটুকু পানি আছে। পানিতে গিয়ে ওরা পড়ে যায়। আমরা তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে নওগাঁ বাজারে মুক্তিবাহিনীদের কাছে পাঠিয়ে দেই। 

তার পরে আমরা পূর্বের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি। নবীপুর গিয়ে একটা নৌকা পেলাম। যে কয়জন জীবিত মিলিটারি পেলাম তাদের নৌকায় তুলে দিলাম। রাস্তায় লতিফ মির্জার সাথে দেখা, ডাক দিয়ে বললো, ‘শোন! যে কয়টা মিলিটারি পাবি ধরে নিয়ে এসে আমার কাছে দিবি। দিলে তোদের পুরস্কার দিব।’ পরে আমি আর আফছার বিলের মধ্যে গিয়ে রাজাকার ধরি। ধরে নিয়ে আসছিলাম সেই সময় জামাল চেয়্যারমানের বাড়ি সামনে এসে এম.এ ইসমাইলের সাথে দেখা। ও বলে ‘কি হে! এদের ধরে কোন দিকে যাচ্ছো?’ আমি উত্তর দিলাম ‘লতিফ মির্জা বলছে ধরে নিয়ে গেলে পুরস্কার দিবে সেই জন্য নিয়ে যাচ্ছি।’ ইসমাইল বলে, ‘তুই চলে যেতে পারিস। এদের আমার কাছে দে।’ পরে দিয়ে দিলাম। ও চলে গেল। ধরে নিয়ে আসলাম তাও কিছু নিতে পারলাম না। আফসোস করতে লাগলাম।

 রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। যেতে যেতে দেখি ওলীপুরে তিন-চার জন এক রাজাকারকে রাইফেলসহ নিয়ে আসছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘নানা কই নিয়ে যাও?’ একজন বলে, ‘রাজাকারকে জমা দিয়ে আসি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে।’ আমি বললাম ‘যাওয়া লাগবে না, যেতে দিচ্ছে না।’ লোকটি বলে, ‘নানা তুমি তাহলে নিয়ে যাও।’ 

পরে রাইফেল আর রাজাকারকে নিয়ে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে জমা দেই। মুক্তিযোদ্ধারা বললো ‘এই দিকে যেয়ে দেখ, লতিফ মির্জা পুরস্কার দিচ্ছে।’ গিয়ে দেখি আমার ভাই আমজাদ আর মেজো চাচা ভাত রান্না করছে। পুরস্কার নেয়ার জন্য দেখি ক্ষেতের আলের উপরে বড় লাইন ধরে আছে সবাই। লাইনে দাঁড়ালাম। লতিফ মির্জা নৌকা থেকে কিছু টাকা নিয়ে এসে আমাদের দিলেন। 

সেই টাকা নিয়ে গ্রামে ফিরে আসি। গ্রামে ঢুকে দেখি কেউ নাই। বাড়িতে এসে দেখি বাড়ি ফাঁকা। চিন্তায় পড়ে গেলাম। এখন কী করি, কোথায় পাই পরিবারের সবাইকে! পরে চলে গেলাম মামার বাড়ি পাশের গ্রাম সুলতানপুর। গিয়ে দেখি সবাই সেখানেই আছে। শুক্রবার সবাইকে নিয়ে ফিরলাম গ্রামে। শনিবার গ্রামে মিলিটারি ঢুকে গ্রাম পোড়াতে শুরু করলো। গ্রামের পরে গ্রাম আগুন আর আগুন। পোড়াতে পোড়াতে মিলিটারি হান্ডিয়াল চলে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা আর যুদ্ধ করলো না মিলিটারিদের সাথে। 

ওই যে মিলিটারি ধরিয়ে দিয়েছিলাম, এখন তারা আমার উপর ক্ষিপ্ত। আমাকে পেলেই গুলি করবে। রহমান নামে এক রাজাকার বিকালে চলে এলো গ্রামে। পালিয়ে পালিয়ে থাকি, কী আর করবো! কিন্তু কয়দিন আর পালিয়ে থাকা যায়। পরে চলে গেলাম শশুর বাড়ি বড়বেলাই।

আমার শ্যালক রহমান রাজাকারও বিয়ে করছে একই গ্রামে। ওরা কীভাবে যেন জানতে পেরেছে আমি বড়বেলাই আছি। জহির মোল্লা, আর রহমানের বাবা বড়বেলাই গ্রামে আসে। এসে গ্রামের প্রধানদের ডাক দিয়ে বলে ‘তারা আলী মিলিটারিদের ধরিয়ে দিয়ে এসে পালিয়ে আছে এই গ্রামে। ও যদি এই গ্রামে থাকে তাহলে মিলিটারিরা এসে গ্রাম পুড়িয়ে দিবে।’ 

পরে আমার শ্বশুর আর গ্রামের প্রধানরা আমার কাছে যান। আমি তখন ক্ষেতে ধান কাটছিলাম। ক্ষেতের মধ্যে গিয়ে আমার শ্বশুর আর বয়োজেষ্ঠ্যরা আমাকে বলেন, ‘জামাই, বিপদ আপদেই আত্মীয় স্বজন। তুমি অনেক দিন যাবত আশ্রয় নিয়ে ছিলে আমাদের গ্রামে। এখন তোমার জন্য যদি বেলাই গ্রাম পুড়িয়ে দেয়? আমাদের গ্রামে কোন মুক্তিযোদ্ধা নাই। একজন আছে পাবনা থেকে পড়াশোনা করা অবস্থায় যুদ্ধে গেছে বলে শুনেছি। কিন্তু গ্রামের সাথে তার কোন সর্ম্পক নাই। তো বাবা তুমি এই গ্রাম থেকে চলে যাও।’ 

পরে আমি সেই ক্ষেত থেকেই চলে যাই শাহজাদপুর আমার ফুফাতো ভাই ছরাব আর ওমরের কাছে। তারা ছিল মুক্তিযোদ্ধা। ভাইদের সাথে ছিলেন ফকরুল, তিনি ছিলেন কমান্ডার। তিনি কোনভাবেই আমাকে মানতে চান না। যাই হোক পরে অনেক কিছু বলার পরে ফকরুল ভাই মেনে নেন আমাকে। সেই জায়গায় বেশ কিছু দিন অবস্থান করি। ভাইদের সাথে এদিক সেদিক যাই। এই ভাবে সেই খানে থাকতে থাকি। 

বেশ কিছুদিন পরে ভারত স্বীকৃতি দিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার। পরে আমি চলে আসতে চাই কিন্তু আমকে আসতে দেয় না। ফুফাতো ভাইরা জানায় এখনও রাস্তা ক্লিয়ার হয় নাই। ৩-৪ দিন পরে আমাকে আসতে দেয়। 

গ্রামে আসার আগেই শুনি রাজাকারদের নাকি ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিবে তার মধ্যে নাকি রহমান রাজাকারও আছে। সেই রহমান রাজাকার এখনও বেঁচে আছে! সেদিন গ্রামে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। পরে চলে যাই সেই আমার শশুর বাড়ি বড়বেলাই। ওখানে কিছু দিন থাকার পরে নিজ গ্রামে ফিরে আসি। 

খাদেমুল হোসেন (তারা) বর্তমানে নওগাঁতেই বসবাস করছেন তিনি নওগাঁ মাজারে খাদেম হিসাবে নিযুক্ত আছেন। আজও জীবিত রাজাকার রহমান এর সাথে ঘৃণায় কথা বলেন না তিনি। যুদ্ধের সময় লতিফ মির্জা তাকে একটা কাগজ দিয়েছিলেন। কিন্তু তার মা ভয়ে তার কাগজটা পুড়িয়ে ফেলেন। যুদ্ধের দলিল বলতে এখন শুধু স্মৃতিটাই আছে তার কাছে।

অনুলিখন: ইমরান হোসাইন

/এসিএন