কমান্ডার শহীদের অপারেশন

Published: Sun, 01 Dec 2019 | Updated: Wed, 11 Dec 2019

‘তখন আমার বয়স সতের বছর। এসএসসি পাস করে জগন্নাথ কলেজে সবে ভর্তি হয়েছি। পাঞ্জাবী-পায়জামা পরতাম। চিবুকে হালকা দাড়ি। উর্দু ভালো বলতে পারতাম। নামাজ কাজা করতাম না। একবার ধরা পড়েও ওই উর্দু ভাষা, দাড়ি আর পোশাকের কারণে ছাড়া পোয়ে যাই। এ ধরণের ক্যামোফ্লেজের কারণেই সহযোদ্ধারা আমাকে মাওলানা বলে ডাকত। ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে আমাদের ক্যাম্পে ঢাকা প্লাটুনের আমি ছিলাম সেকেন্ড ইন কমান্ড। সে জন্য ওরা আমাকে টু আইসি মাওলানা বলে ডাকত’।

কথাগুলো বলেছিলেন মাহবুব আহমেদ শহীদ। একাত্তরে গেরিলা অপারেশনের জন্য ঢাকায় প্রথম যে দলটি আসে তিনি ছিলেন সেই দলের অন্যতম সদস্য। তিনিই সর্বপ্রথম ঢাকায় গাড়িবোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হানাদার বাহিনীকে আতঙ্কিত করে তোলেন। ওই অপারেশনে তিনি ব্যবহার করেন প্রায় ২৫ পাউন্ড এক্সপ্লোসিভ। এছাড়া গুলিস্তান সিনেমা হলের কাছে সে সময় ঢাকার বিখ্যাত চাইনিজ রেস্টুরেন্ট চোচিংচো’তে, চকবাজার মোড়, পাকমোটরের (এখন বাংলামোটর) কাছে দারুল কাবাবঘরে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে তোলপাড় কাণ্ড সৃষ্টি করেন তিনি।

চোচিংচো আর দারুল কাবাবঘর ছিল সে সময়ের হানাদার পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের অন্যতম আড্ডাস্থল। তার বিস্ময়কর ও দুঃসাহসিক সেসব অপারেশনের ঘটনা এখনো তার সহযোদ্ধা বন্ধুদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্মৃতিচারণের অন্যতম বিষয়। যুদ্ধকালীন কমান্ডার ৬১ বছর বয়সী মাহবুব আহমেদ শরীফ ওরফে টুআইসি মাওলানা এখন যুদ্ধদিনের অনেক ঘটনার দিন-তারিখ, সহযোদ্ধা অনেকের নাম ভুলতে বসেছেন। যুদ্ধ শেষে আবার ফিরে গিয়েছিলেন ছাত্রজীবনে। রাজনীতি তাকে টানেনি। লায়ন্স ক্লাবের মাধ্যমে সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত রয়েছেন। সেই সঙ্গে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন ব্যবসা। স্ত্রী ও ২ সন্তান নিয়ে এখন যাপন করছেন প্রায় নির্ঝাঞ্ঝাট জীবন।

মাহবুব আহমেদ শহীদ বলেন- “সে সময় আমাদের বাসা ছিল বকশিবাজারের উর্দু রোডে। বাবা হেমায়েতউদ্দিন ছিলেন পিডব্লিউর একজন কর্মকর্তা। আমরা পাঁচ ভাই ও এক বোন। ভাইদের মধ্যে আমি ৪র্থ। ৭ মার্চের পর ঢাকায় তখন ব্যাপক প্রস্তুতিমূলক অবস্থা। আমরা সহপাঠী বন্ধুদের সঙ্গে ঢাবির ফজলুল হক হলের সামনে প্যারেড করতাম। ২৫ মার্চের সেই ভয়াল রাতের ঘটনাও দেখলাম। বেতারে স্বাধীনতার ঘোষণাও শুনলাম। যুদ্ধে তো যাবই। কিন্তু কোথায় যাব সে সিদ্ধান্ত তখনো নিতে পারিনি। তবে ধারণা ছিল আমাকে ভারতের আগরতলা যেতে হবে।

“আমি এবং মহল্লার আরো ক’জন বন্ধু- এদের মধ্যে ছিল জালাল (বিএমএ’র বর্তমান সভাপতি ডাঃ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন), জিয়া ও সামসু- এপ্রিলের শেষের দিকে যাত্রার প্রস্তুতি নিই। প্রথম দফায় আমি আর শামসু যেতে পারিনি। শাসসু অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমার অভিভাবকরা কিছুটা বাধ সাধলেও আমার বোন আফরোজা ছিল আমার সিদ্ধান্তের পক্ষে। পরের সপ্তাহে, অর্থাৎ মে মাসের প্রথমদিকে আমি আর শামসু আগরতলা পৌঁছাই। আলম এবং ঢাকার অন্য সঙ্গীরাও তখন সেখানে পৌঁছে গেছে। আমাদেরকে নিয়েই মতিনগরে শুরু ঢাকার ছেলেদের প্রথম ক্যাম্প। ক্যাম্পটি ছিল সীমান্তের কাছে। পরে হানাদার বাহিনীর হামলার আশঙ্কায় ওই ক্যাম্প কিছুটা ভিতরে মেলাঘরে স্তানান্তর করা হয়।

“এক মাসের মতো প্রশিক্ষণের পর জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে আমরা ঢাকা অপারেশনের অ্যাসাইনমেন্ট পাই। সাধারণভাবে আমাদের প্রত্যেককে গ্রেনেড আর বেয়নেট দেয়া হয়। কিছু পরিমাণ এক্সপ্লেসিভ ছিল। যদ্দুর মনে পড়ছে, ২টি সাব মেশিনগান দেয়া হয়েছিল। প্রায় ১০০ মাইল হাঁটতে হয় আমাদেরকে। পরিচিত কোন পথ ধরে নয়, গ্রামের পর গ্রাম, মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে, কখনো নৌকায় খাল-বিল পেরিয়ে অবশেষে ঢাকায় পৌঁছাই। ওই পথ পাড়ি দিতে বৃষ্টিতে ভিজেছি, ভেজা কাপড় শরীরেই শুকিয়ে গেছে।

“তারিখটা ঠিক মনে পড়ছে না, জুনের ৮/৯ তারিখের দিকেই হবে, আমি প্রথম অপারেশন চালাই চোচিংচো চাইনিজ রেস্টুরেন্টে। কাপড়ের ব্যাগে আমের আড়ালে গ্রেনেড নিয়ে স্কুটারে রওনা হই গুলিস্তানের দিকে। বিকালের ঘটনা। রেস্টুরেন্টের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গ্রেনেড ছুড়ে দিই। স্কুটার চালক মনে হয় কিছু সন্দেহ করেছিলেন। পিন খুলে ফেলার পর লিভারটা লাফিয়ে ওঠার সময় শব্দ হয়েছিল। তবে তিনি স্কুটার থামাননি। বিকট শব্দে গ্রেনেড ফাটার পর ওই স্কুটারেই ফুলবাড়ির রেললাইন অতিক্রম করে যাই।

“এরপর আমার একাকী দ্বিতীয় অপারেশন ছিল চকবাজার মসজিদ মোড়ে। চকবাজার তখন ছিল ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র। ওই এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের বিরূপ সমালোচনাও চালু ছিল। মুক্তিযোদ্ধা যে তৎপর একথা মানতে চাইত না ওরা। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল জগন্নাথ কলেজে হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে গ্রেনেড ছুড়ব। কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত পাল্টে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের কিছুটা শিক্ষা দেয়ার পরিকল্পনা করি। চকবাজার মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে সমজিদের দোতলা থেকে চৌরাস্তার মোড়ে গ্রেনেড ছুড়ে দিই। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসার সময় মুসুল্লিদের জিজ্ঞাসা করি, ‘নিচে কী হয়েছে? শব্দ কিসের? এত হৈচৈ কেন?’ আমার প্রশ্নে উত্তরে একজন ধমকে উঠে বলেন ‘যান যান, আপনের অতো জানার দরকার নাই। মুক্তিরা বোমা মারছে।’ তখন আতঙ্ক এতটাই ছড়িয়েছিল যে, ঘটনাস্থল থেকে হাফ কিলোমিটার দূরে আমাদের বাসার কাছেও দেখি দ্রুত পালাতে গিয়ে কয়েকটা রিকশা উল্টে গেছে।

“দারুল কাবাবঘরে তৃতীয় অপারেশনে অবশ্য হাজারীবাগের একটি ছেলেকে সঙ্গে নিই। ছেলেটির নাম আবুল। আগের দিন এনায়েতুল হক গামাকে নিয়ে রেকি করে এসেছিলাম। ঢাকায় আসার পর আমি যে কয়জন ছেলেকে ট্রেইন্ড করে তুলি, ও তাদেরই একজন। আমরা ওই অপারেশনে একটি মোটরসাইকেল ব্যবহার করি। আবুল মোটরসাইকেল চালাচ্ছিল। আমি পিছনে বসা। সন্ধ্যার পরের ঘটনা। মোটর সাইকেলে বসা অবস্থাতেই কয়েকটি গ্রেনেড হামলা চালানো হয় ওই সময়। শহীদ মিনারের কাছে মন্ত্রীর গাড়ির ভেতর আমার দলের দুই ছেলে গ্রেনেড ছুড়ে মারে। মন্ত্রী এতে গুরুতরভাবে আহত হন এবং ওই হামলার খবর বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকায় প্রচার হয়”।

১৯ অক্টোবরের গাড়িবোমা হামলা সম্পর্কে মাহবুব আহমেদ শহীদ বলেন, ‘ওই অপারেশন ছিল ভারত থেকে ঢাকায় আমার দ্বিতীয় দফায় আসার পরের অপারেশন। তবে মাসটি অক্টোবর না সেপ্টেম্বর তা মনে করতে পারছি না। মেলাঘর থেকেই ওই অপারেশনের পরিকল্পনা হয়। ৫০ পাউন্ড মতো এক্সপ্লোসিভসহ ৪/৫ জন ছেলেকেও পাঠানো হয় আমার সঙ্গে। তখন ২ নম্বর সেক্টর থেকে একসঙ্গে এক দেড়শ’ গেরিলা যোদ্ধা ঢাকার আশপাশ এলাকার উদ্দেশ্যে রওনা হত। ওই ধরনের একটি দলের সঙ্গে আবারও আমার দীর্ঘযাত্রা শুরু হয়। যাত্রাপথে এক সময় পাকিস্তান আর্মি ও ইন্ডিয়ান আর্মির ক্রসফায়ারের মধ্যেও পড়ি। একবার গাইডের ভুলে পড়ি বিলের মধ্যে। ৫০ পাউন্ডের এক্সপ্লোসিভের ব্যাগ পানিতে ভিজে আরো ভারি হয়ে যায়। অনেক ধকলের পর অবশেষে নৌকায় চেপে বাড্ডা দিয়ে ঢাকায় পা রাখি। ওই অপারেশনে আমি সহযোগিতা নিই আমার বড় ভাইয়ের বন্ধু বংশালের ছেলে মাসুদের। তিনি এখন কানাডায়। মাসুদ গাড়ি চালাতে পারতেন। অপারেশনের প্রয়োজনে ধানমন্ডি থেকে বিএডিসির একটি গাড়ি হাইজ্যাক করি আমরা। ওই সময় আজাদও (রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী) আমাদের সঙ্গে ছিলেন। আমার নির্দেশে এনায়েতুল হক গামা বড় দুই বোমা বানিয়ে রেখেছিলেন।

‘গাড়ি হাইজ্যাকের পরপরই রওনা হই মতিঝিলে হাবিব ব্যাংকের উদ্দেশ্যে। চলন্ত অবস্থাতেই গাড়ির মধ্যে বোমা সেট করি। ৫০ পাউন্ডের মধ্যে ব্যবহার করি অর্ধেকটা। হাবিব ব্যাংক (বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংক) আর শিল্প ব্যাংকের মাঝের যে প্যাসেজ- সেখানে গাড়ি রেখে ফিউজ চার্জ করে নেমে আসি। আমাদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য সেখানে আরেকটা গাড়ি অপেক্ষায় ছিল। ওই গাড়িটি কার ছিল এখন আর মনে করতে পারছিনা। আমাদের গাড়ি ঘটনাস্থল ছেড়ে যখন শাপলা চত্বরের কাছে তখনই প্রচণ্ড শব্দে আশেপাশের অনেক গাড়িও বিধ্বস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্থ হয় ব্যাংক ভবনও। পরে শুনেছি আমাদের মামা মে অ্যান্ড বেকার কোম্পানীর আখতার সাহেবের গাড়িও ওই বিস্ফোরণে উড়ে গিয়েছিল’।