মুক্তিযুদ্ধের গল্প

মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ শিকদারের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ শিকদার তার মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। 

 

 

/এসিএন

ঘর-পালানো তরুণ তুর্কীর যুদ্ধকথা (তৃতীয় অংশ)

[পূর্ব প্রকাশের পর]

আমাদের প্রশিক্ষণ গেরিলা যুদ্ধের, কিন্তু লাগানো হলো নিয়মিত যুদ্ধে, অথচ এ যুদ্ধে আমরা সত্যি অনভিজ্ঞ। ফলে এ যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রায়ই এফএফ যোদ্ধাদের প্রাণ হারাতে হতো। আমরা এফএফদের দিয়ে সীমান্ত যুদ্ধ করানোর ব্যপারে সমালোচনা শুরু করি। এবং কখনো কখনো যুদ্ধে যেতে অস্বীকারও করতে থাকি। একদিন আমাদের ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আমার ধারণা, কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারেন যে, আমরা সবাই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আমাদের এই সমালোচনা একদিন বিদ্রোহে রূপ নিতে পারে, তাই দ্রুত আমাদের দেশের ভিতরে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে আমাদের ডিফেন্স থেকে ছাড় দিয়ে দেশের ভিতরে ঢোকার অনুমতি দিয়ে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। আমাদের দেশের ভিতরে ঢোকার ২৩ মুক্তিযোদ্ধাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এ ২৩ জন হলাম- ১. কুয়াত-ইল ইসলাম, ২. গোলাম মোস্তাফা, ৩. মাহমুদুল আলম, ৪. আব্দুস সামাদ আনসারী, ৫. হাফিজুর রহমান, ৬. এমএ সাত্তার, ৭. শামসুল ইসলাম, ৮. খোরশেদ আলম, ৯. গোলাম সারোয়ার সিদ্দিকী, ১০. রেজাউল করিম, ১১. নুর মোহাম্মদ, ১২. জহুরুল হক রাজা, ১৩. ইদ্রিস আলী, ১৪. দেলোয়ার হোসেন, ১৫. আলতাফ হোসেন, ১৬. মোঃ মোস্তফা, ১৭. আব্দুর রাজ্জাক, ১৮. আলফাজ উদ্দিন, ১৯. মোঃ আলম, ২০. আব্দুর রহমান, ২১. আল-মাহমুদ, ২২. বরাত আলী ও ২৩. অনিল চন্দ্র সরকার।। নাম সম্বলিত তালিকায় স্বাক্ষর করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকার এমপিএ ডা. মঈনুদ্দিন আহমেদ। আমরা যখন সীমান্ত থেকে দেশের ভিতরে ঢোকার অপেক্ষায় আছি তখন সোনা মসজিদের কাছে অপারেশনে গিয়ে শহীদ হন বাংলাদেশ বাহিনীর ক্যাপ্টেন নাজমুল।


আমরা ভারতের জলঙ্গী দিয়ে ডিগ্রির চর এলাকায় এসে জনগণের কাছে আশ্রয় নেই। দেখলাম ইতিমধ্যেই ওই এলাকার জনগণ মুক্তিযুদ্ধের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কী করতে হবে তা রপ্ত করে ফেলেছে। গ্রামবাসী বিভিন্ন বাড়ি থেকে চালডাল তুলে আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিল, কে কোন বাড়িতে থাকবে তার থাকার ব্যবস্থাও তারাই করে দিল। পরের দিন ইলিশ ধরা জেলেদের সহযোগিতা নিয়ে পার হলাম পদ্মা নদী। ঠাঁই পেলাম রাজশাহীর নাটোরের মধ্যে। সেখানে একজন গাইড ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা নিয়ে চলে এলাম চলনবিল এলাকার অষ্টমণীষা মির্জাপুরে। এক গ্রামে আশ্রয়ে থাকার সময় এলাকার লোকজন অভিযোগ করলো যে, গেদু নামের জনৈক ‘মুক্তিযোদ্ধা’ মুক্তিযুদ্ধের দল চালানোর নামে জনগণের কাছে থেকে চাঁদা তুলছে। তার বিরুদ্ধে ডাকাতির অভিযোগও করলো কেউ কেউ। আমরা ভাবলাম, যদিও এটা আমাদের এলাকা নয়, তবুও এর একটা বিহিত করা দরকার। নইলে মুক্তিযুদ্ধের সমূহ ক্ষতি হবে। সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় তাকে আটক করা হলো। জনসমক্ষে বিচার করে জনগণকে সন্তুষ্ট করে সেখান থেকে বিদায় নিলাম আমরা। এরপর উল্লাপাড়ার নওকর গ্রাম হয়ে আমরা স্থায়ী আস্তানা গড়লাম আমাদের খামার উল্লাপাড়া-সড়াতৈল এলাকায়। 

আগেই বলেছি, আমাদের কমান্ডার কুয়াত-ইল ইসলাম। তিনি ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬৯-‘৭০ ছাত্র সংসদ রাকসুর সহ-সাহিত্য সম্পাদক। তিনি এলাকায় এসে কয়েক দিনের মধ্যেই প্রস্তাব করলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য আমাদের একটা পত্রিকা দরকার। আমরা ভাবলাম, কুয়াত ভাই কবিতা-টবিতা লেখেন, সে বাতিক এ যুদ্ধের সময়ও যায় নি। এখন যুদ্ধের সময় আমরা পত্রিকা করবো কখন? কেউ কেউ দ্বিমত পোষন করলাম, কেউ বা বিরক্তির সঙ্গে নিশ্চুপ রইলাম। তিনি কোথা থেকে একটি প্রেসের খবর নিয়ে এলেন। দৌলতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা মতিউর রহমানের সহযোগিতায় লোক জোগাড় করলেন সে প্রেস আনার জন্য। এক রাতে আমরা সে প্রেস এনে বসিয়ে দিলাম বেলকুচি থানার দৌলতপুর স্কুলের কাছে। পরে দেখেছি, সে প্রেস থেকে অক্টোবরের শেষের দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক জুলফিকার মতিনের সম্পাদনায় ‘বাংলার মুখ’ নামের একটি পত্রিকা বের হতে। যত দূর মনে পড়ে, ওই প্রেস থেকেই স্বাধীনতা বিরোধীদের হুশিয়ারী দিয়ে লিফলেটও ছাপা হতো। আমরা সাধারণ মানুষের মধ্যে বাংলার মুখ পত্রিকা ও লিফলেট বিলি করেছি। 

আমরা ওই এলাকার কয়েকটি গ্রামে ঘোরাফেরা করি। এতে স্বাধীনতা বিরোধীরা এলাকা ছেড়ে থানা সদরে আশ্রয় নেয়। আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত রক্ষার উদ্যোগ নেই। বিভিন্ন গ্রামে গ্রাম বৈঠক, ইউনিয়ন বৈঠক, পোস্টারিং, লিফলেটিং করতে থাকি। আমরা চেষ্টা করি জনগণের সঙ্গে মিশে থাকার জন্য। এদিকে, উল্লাপাড়া স্টেশনের কাছে ছোনতলায় পাক-সেনাদের একটি ক্যাম্প ছিল, তারা অক্টোবরের শেষের দিকে সেখানকার বেশ কিছু যন্ত্রপাতির ক্ষতি করে চলে যায়, এতে আমাদের চলাচলের এলাকা আরো বেড়ে যায়। এ সময় খবর পাওয়া যায় যে, সলপের পাশের বেতকান্দি কামারপাড়ার পাশে অবস্থানরত রাজাকারেরা ভীতসন্ত্রস্থ হয়ে পড়েছে। খবর পাওয়া পর ওই রাজাকার দলকে ঘেরাও করে ৪০ জন রাজাকারকে ৪০টি থ্রিনটথ্রি রাইফেল সহ আত্মসমর্পন করানো হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে গণআদালত বসিয়ে বিভিন্ন শাস্তি দেওয়া হয়। এতে আমাদের দলে ৪০টি রাইফেল জমা হয়। তখন স্থানীয় ভাবে রিক্রুট করা দল বড় করা হয়। কিন্তু গেরিলা যুদ্ধে বড় দল কাম্য নয়। তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, আমাদের দলে থাকা অন্য এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা চলে গিয়ে তাদের এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাজ করবে। এ সিদ্ধান্তের পর উল্লাপাড়ার বঙ্কিরহাটের আব্দুস সামাদ, উল্লাপাড়ার দেলোয়ার, উল্লাপাড়ার ঘাইটনার ইদ্রিস, কাজীপুরের মানিকপটলের আলতাব স্ব স্ব এলাকায় চলে যায়। 

আমাদের গেরিলা গ্রুপের মতোই আরো কয়েকটি গ্রæপ ওই এলাকায় অবস্থান করছিল। তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে মালিপাড়া পাক-বাহিনী ক্যাম্পে আক্রমনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তারিখ নির্দ্ধারণ হয় ২৬ নভেম্বর। এ আক্রমনে যুক্ত হন আব্দুল হাই, আব্দুস সামাদ এবং আমরা সহ আরো কয়েকটি গ্রুপ। আমাদের যুদ্ধের কৌশল ছিল পাক-সেনাদের ওপর আক্রমন করে ভীত-সন্ত্রস্থ করে নিজেদের কোনও ক্ষতি হতে না দিয়ে ফিরে আসা। আমরা সেটাই করি। পরের দিন সকালে খবর আসে যে, পাক-সেনারা মালিপাড়া ক্যাম্প ছেড়ে সিরাজগঞ্জ শহরের দিকে চলে গেছে। আমরা রাস্তায় তাদের আক্রমনের উদ্যোগ নেই, কিন্তু সে সুযোগ না দিয়ে তারা আগেই পার হয়ে চলে যায়। আমরা তখন মালিপাড়া গিয়ে সেখানে স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়ে দেই। ডিসেম্বরের প্রথম দিকে খবর পাওয়া যায় যে, নগরবাড়ি-বগুড়া সড়ক ধরে পাক-সেনাদের বিভিন্ন গ্রুপ ঢাকার দিকে চলে যাচ্ছে। আমরা তাদের ওপর আক্রমনের সিদ্ধান্ত নেই। আমরা তালগাছীর মাকড়কোড় গ্রামের পাশে নগরবাড়ী-বগুড়া সড়কের নিরাপদ দূরে ট্রেন্স খুঁড়ে পজিশন নেই। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২৫ জনের একটি গ্রুপকে আসতে দেখা যায়। কাছাকাছি এলে তাদের ওপর গুলিও চালানো হয়। কিন্তু তারা ক্ষিপ্রতার সঙ্গে রাস্তার অপর পাড়ে নেমে পড়ে এবং ডাবল মার্চ করে সেখান থেকে চলে যেতে পারে। আমাদের অনভিজ্ঞতাই হয়তো তাদের বাঁচিয়ে দেয়। 


ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকে বিজয়ের শুভক্ষণ। ১৬ ডিসেম্বর, আমরা সেদিন চরনবীপুর গ্রামে শেল্টার করে আছি, সে গ্রামেই আমরা খবর পাই যে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আমরা বিজয়োল্লাস করতে করতে শেল্টার থেকে বেড়িয়ে আসি। এবং প্রকাশ্যে এসে সেদিনের মতো ক্যাম্প করি চরনবীপুর স্কুল প্রাঙ্গণে। 

সকল মুক্তিযোদ্ধা প্রকাশ্যে চলে আসে। বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এলাকার প্রধান মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প হয়ে ওঠে এনায়েতপুর বেতিলে। আমরাও সেই ক্যাম্পে যোগ দেই। এর মধ্যে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি স্বাধীন দেশে পা রাখেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ করার নির্দেশ দেন। এ নির্দেশের পর মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশাসনের মহুকুমা প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে বাড়িতে ফিরে আসি। ফিরে যাই কলেজে।  
[সমাপ্ত]

 

/এসিএন

ঘর-পালানো তরুণ তুর্কীর যুদ্ধকথা (দ্বিতীয় অংশ)

[পূর্ব প্রকাশের পর]
মোহনপুরের কাছে গিয়ে রেললাইনে উঠি। সে লাইন ধরে হাঁটতে থাকি ঈশ্বরদীর দিকে। কিন্তু সে পথে চলা তখন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, চলনবিল তখন বর্ষার পানিতে ভরে গেছে। রেললাইনটি শুধু জেগে আছে, সে রেললাইনে মাঝে মধ্যেই পাক-বাহিনী রেলইঞ্জিন নিয়ে টহল দিতে আসে। তারা এসে পড়লে রেললাইন ছেড়ে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই, নির্ঘাত ধরা পড়তে হবে তাদের হাতে। তবুও আগে পিছে দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটতে থাকি আমরা ৬ জন। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। আমরা সন্ধ্যার পর গিয়ে দিলপাশার স্টেশনে পৌঁছি। কিন্তু ওখান থেকে রেজাউলের আত্মীয় বাড়ি নৌকা ছাড়া পৌঁছা সম্ভব নয়। একজন মাত্র দোকানদার বসে আছে, সে জানালো, আর কিছুক্ষণ পরে ঈশ্বরদী থেকে পাক-বাহিনী ইঞ্জিন নিয়ে আসবে, তাই এখান থেকে এখনই সরে না পড়লে ধরা পড়তে হবে পাক-বাহিনীর হাতে। 

কিভাবে নৌকা পাবো এ চিন্তায় আমরা দিশেহারা হয়ে নৌকা খুঁজতে থাকি। কাছেই একটা জেলে নৌকা পাওয়া যায়, কিন্তু সে এখন নিয়ে যেতে পারবে না। বাধ্য হয়ে তাকে ভয় দেখাই, সে তখন পার করে দিতে রাজী হয়। আমরা নৌকায় উঠে রওনা হওয়ার দুদণ্ডের মধ্যেই চলে আসে রেলইঞ্জিনটি। আমরা অল্পের জন্য পাক-সেনাদের হাতে ধরা পড়া থেকে বেঁচে যাই। দূরত্বের কারণে রেজাউলদের সঙ্গে এ আত্মীয় বাড়িতে কোনও যোগাযোগই নেই, ওরা আমাদের পেয়ে খুব খুশি হয়। অনেক আদরযত্ন করে। 

পরের দিন সকালে উঠেই রওনা হই রেল লাইন ধরে। গুয়াখাড়া স্টেশনের কাছে গিয়ে রেললাইন ছেড়ে হাঁটতে থাকি পশ্চিম দিকে। দয়ারামপুুর জমিদার বাড়ি পার হয়ে এবার খুঁজতে থাকি টুনিপাড়া শহীদুলের আত্মীয় বাড়ি। খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে পাওয়া গেল সে বাড়ি। তাদের থাকার ঘর একটাই, সে ঘরের মেঝেতেই কাঁথা বিছিয়ে সবার থাকার ব্যবস্থা হলো। আবার ভোরেই রওনা হলাম তাদের অনেক অনুরোধ সত্বেও, কারণ আমরা তো নিমন্ত্রণ খেতে আসিনি, যত তাড়াতাড়ি পারি আমাদের সীমান্ত পার হতে হবে।

হাঁটতে হাঁটতে আবার রেললাইন, আব্দুলপুর স্টেশনের পাশ দিয়ে রেললাইন পার হয়ে আমরা চলে এলাম রাজশাহী জেলার চারঘাটের কাছে পদ্মা নদীর কাছে। আমাদের সবার কাছে টাকাকড়ির অভাব, অনেক খুঁজে সস্তায় একটা নৌকা পাওয়া গেল। তাতে পদ্মা পার হয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ভারতের নদীয়া জেলায়। নাম লেখালাম কেচুয়াডাঙ্গার বিধানচন্দ্র বিদ্যানিকেতনে স্থাপিত ইয়ুথ ক্যাম্পে। সেখানে পাবনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকেও অনেতে এসেছে মুক্তিযুদ্ধে নাম লেখাতে। পাবনার ছিল বকুল, সাইদুল, শফি, রাজ্জাক সহ অনেকেই। এর সপ্তাহ দুয়েক পরেই একদিন ৬০/৭০ জন ছেলে নিয়ে ক্যাম্পে এলেন শাহজাদপুরের এমপি আব্দুর রহমান। তিনি এসে দু’তিন দিন পর আমাদের শত খানেক তরুণকে নিয়ে গেলেন বেড়ার এমএনএ অধ্যাপক আবু সায়ীদের বালুরঘাট কামারপাড়া ক্যাম্পে। কিন্তু তিন দিন পরই আবার ফিরে আসতে হলো আগের ক্যাম্পে। এই টানাহেঁচড়ার মধ্যে ক্যাম্প থেকে দেশে ফিরে গেল শহীদুল। আবার কয়েকদিন পরই আগের ক্যাম্প শিফট করে আমাদের চলে আসতে হলো পাতিরামপুর নতুন ক্যাম্পে।

পাতিরামপুর নতুন ক্যাম্পে সকাল-বিকাল প্যারেড পিটির পাশাপাশি চলতে লাগলো প্রশিক্ষণের জল্পনা কল্পনা, কবে আমাদের হায়ার ট্রেনিংয়ে পাঠানো হবে এসব। একদিন হঠাৎ করে ক্যাম্পে হাজির হলেন আমাদের সঙ্গী সরোয়ারের বাবা আবু বকর, তিনি তার ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে চলে এসেছেন এখানে। তার আগে কোলকাতায় গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের খুঁজে বের করে এ ক্যাম্পের নাম পেয়েছেন। তিনি সারাদিন আমাদের সঙ্গে থাকলেন, এলাকার পরিস্থিতি, সবার বাড়ির খবর জানালেন। বিকেলের দিকে অশ্রু সজল চোখে আমাদের কাছে থেকে বিদায় নিলেন।

১৪ আগস্ট আমাদের ইয়ুথ ক্যাম্পে একটি টিম এলো হায়ার ট্রেনিংয়ে রিক্রুট করতে। ওই দিনই খুব সহজেই আমরা ৫ জন রিক্রুট হয়ে গেলাম। এখন শুধু মনোযোগ দিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া, অস্ত্র হাতে এলাকায় ফিরে যাওয়া আর শত্রু হননে মেতে উঠে দেশকে হানাদার মুক্ত করা। পরদিন ১৫ আগস্ট আমরা রওনা হলাম হায়ার ট্রেনিংয়ের উদ্দেশ্যে। আমরা সমতলের মানুষ, কিন্তু আমাদের যেতে হবে পাহাড়ে। প্রথমে ট্রাকে, তারপর ট্রেনে, আবার ট্রাকে সমতল থেকে আমরা যেতে লাগলাম পাহাড়ের দিকে। সমতলের মানুষ, পাহাড় দেখার উত্তেজনা অনুভূতি আলাদা। 

ট্রেন আমাদের নামিয়ে দিল শিলিগুড়িতে, তারপর আবার ট্রাকে পাহাড়ের আঁকাবাকা পথে, অবশেষে আমরা পৌঁছে গেলাম পানিঘাটা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। শুরুতেই নামধাম লিখে আমাদের পড়ার জন্য কিছু কাপড়চোপর, খাওয়ার জন্য একটি প্লেট একটি মগ দেওয়া হলো। আমাদের থাকার  ব্যবস্থা হলো তাবুতে। ঝর্ণার পাশে স্থাপন করা হয়েছে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। ক্যাম্পের পাশ দিয়ে ঝর্ণার পার  হতে ঝুলন সেতু, যা আমাদের এলাকায় অকল্পনীয়। 

পরদিন শুরু হয়ে গেল ৪০ দিনের প্রশিক্ষণ। ৩৬ গ্রেনেড, থ্রিনটথ্রি রাইফেল, এসএলআর, স্টেনগান, সাব-মেসিন গান, মর্টার গান- পর্যায়ক্রমে এক্সপ্লোসিভ প্রশিক্ষণও হতে লাগলো। সকালে প্যারেড-পিটি, ৮টার দিকে চা-নাস্তা, এরপর অস্ত্রের প্রশিক্ষণ, ১১টার দিকে চা-নাস্তা, ১টা পর্যন্ত অস্ত্র প্রশিক্ষণ, দুপুরে গোসল খাওয়া অল্প বিশ্রাম, ৩টার দিকে আবার প্রশিক্ষণ বিকেল পর্যন্ত। প্রশিক্ষণ চলাকালে বিভিন্ন এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গেও পরিচয় হতে লাগলো। সিরাজগঞ্জ মহুকুমারই পাওয়া গেল অনেককে। এর মধ্যে তাড়াশের আমজাদ হোসেন মিলনকে দোভাষী হিসেবে পেলাম আমরা, কারণ সে হিন্দি ভালো বুঝতো। 

শেষ পর্যায়ে এসে আমাদের সেকশনে ভাগ করে গ্রুপ করে দেওয়া হলো। আমাদের গ্রুপ হলো ২৩ জনের, গ্রুপের কমান্ডার হলেন কুয়াত-ইল ইসলাম। গ্রুপ কমান্ডার কুয়াত-ইল ইসলামের সঙ্গে আমাদের আগে পরিচয় ছিল না, প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে এসেই পরিচয়। যদিও তিনি আমাদের এলাকারই লোক। তিনি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতা এবং তখনকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-সংসদের সহ-সাহিত্য সম্পাদক। প্রশিক্ষণ শেষে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমাদের পাঠানো হলো মোহদীপুর ক্যাম্পে, সেখান থেকে পাঠানো হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের অপর পাড়ে। সেখানে ভারতীয় সেনাদের নিয়ন্ত্রণে আমাদের দায়িত্ব দেওয়া হলো ভারতীয় ডিফেন্সে। আমরা সেখানে নিয়মিত সীমান্ত পাহারা দিতে লাগলাম, পাশাপাশি রাতে সীমান্ত পার হয়ে পিছন দিক থেকে পাক-সেনাদের ওপর হামলা চালাতাম। 
[চলবে]

 

লেখক- মুক্তিযোদ্ধা নূর মোহাম্মদ নূরনবী

/এসিএন

ঘর-পালানো তরুণ তুর্কীর যুদ্ধকথা

[প্রথমাংশ]
তারুণ্যের ধর্মই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা। ১৯৭১ সালে সে নেশাই চেপেছিল তরুণদের মাঝে। তাদের বেশীর ভাগই বাড়িতে বাবা-মাকে না জানিয়ে চলে যেতো মুক্তিযুদ্ধে, মেতে উঠতো শত্রু হননে। শাহজাদপুরের আগনুকালী গ্রামেরও ৬ তরুণ একদিন বাড়িতে কাউকে না জানিয়ে চলে যায় সীমান্তের ওপারে। এদের ৫ জন প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে আসে নিজ এলাকায়, মেতে ওঠে শত্রু হননে। বাড়ি থেকে পালানো ওই তরুণদের মধ্যে আমিও একজন। 

আমি নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরনবী। আমার জন্ম ১৯৫৪ সালের ১ জানুয়ারি। আমার পিতা: জুলমাত আলী কৃষিকাজ করতেন। মাতা: জয়নব বেগম গৃহিণী। গ্রাম: আগ নুকালী, ইউনিয়ন: বেলতৈল, থানা: শাহজাদপুর. মহুকুমা: সিরাজগঞ্জ। প্রাইমারি স্কুল থেকে পাশ করে খাস সাতবাড়িয়া হাই স্কুলে ভর্তি হই। উনসত্তুরের ৬ দফা ও ১১ দফার ছাত্র আন্দোলনের সময় আব্দুল লতিফ মির্জা, কোরবান আলী, বাকী মির্জা, গোলাম আজম, শহীদুজ্জামান হেলাল প্রমুখ ছাত্রনেতা আমাদের স্কুলে আসতেন। এরা সবাই পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ করতেন, আসতেন সিরাজগঞ্জ বা শাহজাদপুর থেকে। এভাবেই স্কুল জীবনে রাজনীতির হাতেখড়ি আমার। ১৯৭০ সালে ওই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে উল্লাপাড়া আকবর আলী কলেজে ভর্তি হই। সত্তুরের শেষের দিকে ১ম বর্ষ অ্যানুয়াল পরীক্ষার ফরম ফিলাপ করে গ্রামে ফিরে আসি। 

১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান জাতীয় সংসদের আসন্ন অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। এ ঘোষণার মধ্যে দিয়ে দেশের রাজনীতি নতুন মোড় নেয়। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে সাধারণ মানুষ। তারা মনে করতে থাকে যে পাকিস্তানিদের সঙ্গে বাঙালিদের আর এক সঙ্গে থাকা সম্ভব নয়। ফলে রাষ্ট্র-প্রশাসনে দেখা দেয় অস্থিরতা, নিরাপত্তার অভাব অনুভূত হতে থাকে সর্বত্র। শহরের মানুষ গ্রামে ফিরে আসতে থাকে। আমার প্রাইমারি স্কুলের বন্ধু জহুরুল হক রাজাও তার পরিবারের সঙ্গে মার্চের শুরুতেই চলে আসে তাদের গ্রামে। দেশের এ পরিস্থিতিতে আমাদের পড়াশোনা লাটে ওঠে, আমরা সব সময় কী ঘটছে না ঘটছে তা জানতে গ্রামের সড়কের পাশে কালীবাড়িতে জমায়েত হতে শুরু করি। সেখানে এক দোকানে রেডিও ছিল, তা থেকে খবর শোনার জন্য গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা জমায়েত হতো। রাজনীতির নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা চলতো সেখানে। ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর রেসকোর্সের ভাষন শোনার জন্য গ্রামের সবাই ভেঙ্গে পড়ে কালীবাড়িতে, কিন্তু সেদিন ভাষণ প্রচার না হওয়ায় সবাই হতাশ হয়ে পড়ি। পরের দিন সকালে আমরা সে ভাষণ শুনতে পাই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ঘোষনাকে স্বাধীনতার ঘোষণা, আর অন্য সব কিছুকে কৌশল মনে হয় আমাদের। গ্রামে-গ্রামে শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি।   

আমাদের এলাকায়ও অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু হয়। আমাদের গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে এগিয়ে আসেন গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক আব্দুস সোবহান। প্রশিক্ষক হিসেবে আরো এগিয়ে আসেন ইপিআর সদস্য আলতাব হোসেন, তিনি তখন ছুটি নিয়ে এলাকায় অবস্থান করছিলেন। প্রথম অবস্থায় বাঁশের লাঠি হাতে বিকেলে আমরা প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করি। গ্রামের প্রায় পঞ্চাশ জন তরুণ প্রশিক্ষণ নিতে থাকি। একই সময় সাতবাড়িয়া হাই স্কুল মাঠেও শুরু হয় প্রশিক্ষণ। 
দিন গড়াতে থাকে। ২৫ মার্চে গভীর রাতে ঢাকায় নিরস্ত্র সাধারণ বাঙালিদের ওপর হামলে পড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়ে পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থা। ঢাকা, চিটাগাং, রাজশাহী, খুলনা থেকে বাড়ি ফিরতে শুরু করে সাধারণ মানুষ। আমরা গ্রামের তরুণেরা কালীবাড়ি রাস্তার পাশে ভিড় করে তাদের কাছে থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নানা অত্যাচারের খবর সংগ্রহ করতে থাকি। পাশাপাশি তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা বিশেষ করে পানি খাওয়ানো, প্রয়োজনে ক্ষুধার্তের আহার জোগানোর কাজে সহযোগিতা করতে থাকি আমরা। এ সময়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ব্যবস্থা সম্পূর্ণই ভেঙ্গে পড়ে, এলাকায় বেড়ে যায় ডাকাতের উপদ্রব, বিশেষ করে যে সব তাড়া খাওয়া মানুষ নিজ বাড়িতে ফিরছিল তাদের ওপর। তখন রাত জেগে পাহারা, দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের রাত যাপন ও নিরাপত্তার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করি আমরা গ্রামের তরুণেরা। 

২৫ এপ্রিল বাঘাবাড়ি ও বগুড়ার দিক থেকে নগরবাড়ি-বগুড়া সড়ক দখলে নেয় পাক-বাহিনী। থমথমে অবস্থা নেমে আসে আমাদের এলাকায়। তখন সশস্ত্র যুদ্ধ ছাড়া আর কোনও বিকল্পই খোলা থাকে না। আমরাও খুঁজতে থাকি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার পথ। এ ব্যপারে আমরা তরুণেরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করি। অবশেষে আমরা ৬ জন মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হই। ৬ জন হলাম আমি, জহুরুল হক রাজা, রেজাউল করিম লেবু, শহীদুল ইসলাম, গোলাম সরোয়ার ও আব্দুস সাত্তার। এদের মধ্যে আমরা ৫ জন আগ-নুকালি গ্রামের আর আব্দুস সাত্তারের বাড়ি খামার উল্লাপাড়া গ্রামে। আমরা খবর পাই যে, সাতবাড়িয়া গ্রামের শফি ও রাজ্জাক সীমান্তের ওপারে গিয়েছিল, এদের মধ্যে শফি বাড়ি ফিরে এসেছে। আমরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং কোন রাস্তায় যাওয়া যাবে তার একটা ধারণা নেই। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সীমান্তের ওপারে যাওয়ার প্রাথমিক রাস্তা ঠিক করে ফেলি। নিজেদের যাওয়ার পথের ছকে কোথায় কার আত্মীয়বাড়ি বা পরিচিত জন আছে তা-ও খুঁজে বের করি যাতে যাওয়ার পথে ব্যবহার করতে পারি সেসব বাড়ি। আমরা সিদ্ধান্ত নেই যে, আমরা বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে কারো বাড়িতে জানাবো না, তাহলে বাড়ি থেকে বাঁধা আসতে পারে। আবার চলে যাওয়ার পরে বাড়ির মুরুব্বিরা যেন নিশ্চিত হতে পারে যে আমরা সীমান্তের ওপারে চলে গেছি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। যাতে কারো পরিবার আমাদের পালানো নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় না পড়ে। 

জুন মাসের শেষের দিকে আমরা ৬ জন গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বের হই যাতে কেউ সন্দেহ করতে না পারে। আমাদের কারো কাছে লুঙ্গি-গামছা ছাড়া বাড়তি তেমন কিছু নেই। তবে রাস্তায় ক্ষুধা লাগলে যাতে খেতে পারে সে জন্য কেউ সঙ্গে নিয়েছে ছাতু, কারো আছে চিড়া। আর ৫/১০টাকা করে যার যা সামর্থ আছে সে নিয়েছে, তবে কুড়ি টাকার ওপরে কারো কাছে নেই। গ্রাম পার হয়ে আমরা মিলিত হই, হাঁটতে থাকি তালগাছীর দিকে। হাঁটতে থাকি আর পিছনে তাকাই আমাদের কেউ দেখে ফেললো কিনা? কিছু দূর যাওয়ার পর হুড়াসাগর নদীর কাছাকাছি এসে দেখতে পাই যে, আমাদের পিছু নিয়েছে রাজার বাবা আব্দুল করিম মোক্তার সাহেব। কিন্তু আমাদের কোনোক্রমেই ধরা পড়া যাবে না যে, আমরা সীমান্তের ওপারে যাচ্ছি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। সবাই মিলে ঠিক করে ফেলি যে, আমরা হুড়াসাগরে এসেছি, বর্ষার নতুন পানিতে গোসল করব। যা ভাবা তাই কাজ। নেমে পড়লাম হুড়াসাগরে। রাজার বাবাও কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো যে, আমরা কোথায় যাচ্ছি? আমরা তাকে জানালাম, বর্ষার নতুন পানিতে গোসল করে বাড়ি ফিরবো। তিনিও আমাদের সঙ্গে নেমে পড়লেন গোসলে। কিন্তু আমরা কমবয়সী মানুষ, আমাদের তো ক্লান্তি নেই। আমাদের ভাবটা এমন যে, চোখ লাল না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এ গোসল থামবে না। রাজার বাবা বয়স্ক মানুষ, এক সময় হার মানলেন। নদী থেকে উঠে বললেন, তোমরা গোসল সেরে বাড়ি চলে এসো, আমি চলে গেলাম। আমরাও এটাই চাচ্ছিলাম। তিনি উঠে অনেক দূর যাওয়ার পরে আমরা নদী পার হয়ে অন্য পাড়ে উঠে পড়লাম। এদিক সেদিক দেখে গাড়াদহর কাছে নগরবাড়ি-বগুড়া সড়ক পার হয়ে রওনা হলাম মোহনপুরের দিকে, কারণ আমরা প্রথম দিনের শেষে রাত পার করবো দিলপাশারের কাছে মাগুড়া গ্রামে আমাদের সঙ্গী রেজাউলের এক আত্মীয়ের বাড়িতে। 
[চলবে]

 

লেখক- মুক্তিযোদ্ধা নূর মোহাম্মদ নূরনবী

 

/এসিএন

টুনিরহাটে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি...

[তৃতীয় পর্ব]
রাস্তার দু’পাশের ধান ক্ষেত কুয়াশায় ঢাকা থাকায় সামনের জনকে দেখার যাচ্ছে না। তবুও শীতের রাতে হেঁটে চলেছি আমরা প্রায় তিরিশ মুক্তিযোদ্ধা। প্রায় তিন ঘণ্টা হাঁটার পর গাইড জানালো আর বেশি দূরে নয় টুনিরহাট। টুনিরহাটের এক পাশে ডাঙ্গার হাট, অপর পাশে খোকার হাট। মাঝখানের টুনিরহাটে শত্রু সেনাদের ক্যাম্প। 

একটা ছোট্ট খাল। শীতকাল বলেই হয়তো খালটি শুকনা খটখটে। খালটা পাড় হতেই হঠাৎ থমকে গেলাম আমরা সবাই। সামনেই মাত্র দশ হাত দূরে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে পাকিস্তানি দস্যূরা। ফলইন করিয়ে হয়তো তাদের ডিউটি ভাগ করা হচ্ছে। থমকে দাঁড়ালাম সবাই, এক ঝটকায় ওদের সুযোগ না দিয়েই খালের আড়ে পজিশন নিলাম, ওরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের কেউ এক জন পিন খুলে ছুড়ে দিল গ্রেনেড। প্রথম সুযোগে আমরা জিতে গেলাম। এবার পিছু হটার পালা। কিন্তু আমাদের বিপত্ত্বি বাধালো ওদের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। সেখান থেকে এলএমজির ব্রাস ফায়ার আসতে লাগলো। আমরাও পাল্টা গুলি চালাই আর পিছু হটি, কিন্তু আমাদের এদিক থেকে যদি পাঁচটি গুলি ছুড়তে পারি তো ওরা ছোড়ে শত শত। ফলে ছত্রভঙ্গ হতে হলো আমাদের। 

হাইডে ফিরে এলাম, কিন্তু গুণে দেখা গেল আমাদের দু’জন তখনো ফেরেনি। এক জন ময়মনসিংহের আরশেদ, অন্যজন আমাদের বাহুকার শহীদুল। দুই জন সহযোদ্ধা নিখোঁজ! এটাতো হতে পারে না। ফলে আবার ফিরে যাই টুনির হাটের কাছে। আতিপাতি করে খুঁজতে থাকি সহযোদ্ধা দুজনকে। খুঁজতে খুঁজতে শহীদুলকে পাওয়া গেল একটি ধান ক্ষেতের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে, কিন্তু আহত হয়নি। স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলা গেল ওকে পেয়ে। 

স্থানীয় এক জন জানালো, পাশেই অন্যজন পড়ে আছে আহত হয়ে, যুদ্ধ হয়েছে সেখানে, হয়তো মুক্তিযোদ্ধাই হবে। সেদিকে ছুটলাম আমরা কয়েক জন। খুঁজে পাওয়া গেল আরশেদকে, তবে জীবিত নয়। এলাকাবাসী জানালো, যুদ্ধ চলাকালে সে এখান দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছিল, এ সময় তার শরীরে গুলি লাগে। এলাকাবাসী তাকে টেনে তুলে নেয়, স্থানীয়ভাবে হাজারো চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারেনি। শহীদ হয় আরশেদ। আমরা এলাকাবাসীর সহায়তায় আশরাফের মরদেহ নিয়ে আসি আমাদের হাইড হিসেবে পরিচিত মধ্যছাতনাই গ্রামে। তারপর তাকে যথাযোগ্য মর্যাদায় কবরস্থ করি। তখনই মধ্য ছাতনাই গ্রামটি শহীদ আরশেদনগর নামে নামকরণ করা হয়।

দিন গড়ায়, মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বে চলে আসি আমরা। ২১ নভেম্বর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, ভারতীয় সেনাবাহিনী হয়ে ওঠে আমাদের মিত্র বাহিনী, যা আগেও ছিল, কিন্তু ঘোষণা দিয়ে নয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নিয়ে গঠন করা হয় যৌথ বাহিনী। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমাবেশ ঘটতে থাকে সীমান্তে, বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। বিএসএফ সদস্যরা বলতে শুরু করে, তোমাদের এখন অন্য সেক্টরে পাঠানো হবে। আমরা তখন নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠি। এর মধ্যে ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান হামলা চালায় ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে, তাদের বিরোধের স্থান কাশ্মীর সীমান্তে। ফলে যুদ্ধে ভারতে সহযোগিতার লুকোচুরির সমাপ্তি ঘটে। প্রকাশ্যেই নেমে পড়ে ভারত। ফলে সীমান্ত যুদ্ধে এফএফ গেরিলাদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়। আমরা গোঁ ধরতে থাকি এলাকায় ফিরে যাওয়ার।
 
ভারতের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর আমাদের এলাকায় ফিরে যেতে বলা হয়। কারণ, সীমান্ত এলাকা থেকে তখন পাকিস্তানিরা যুদ্ধের চাপে সরে আসতে বাধ্য হচ্ছিল কেন্দ্রের দিকে। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের সীমান্ত এলাকায় থাকার আর কোনও প্রয়োজন ছিল না। এজন্য বিএসএফের ব্যবস্থাপনায় আমাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় মাইনকারচর। সম্ভবত ১১ ডিসেম্বর মাইনকারচরে পৌঁছে শুনতে পাই, আহসান হাবীবসহ অনেকেই- যারা এক সঙ্গে এলাকা ছেড়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে- তারা কিছুক্ষণ আগেই রওনা হয়েছে সিরাজগঞ্জের উদ্দেশ্যে। তারাও নিশ্চয়ই অন্য সীমান্তে আমাদের মতোই যুদ্ধ করে এখন এলাকায় ফিরে যাচ্ছে। আমরাও দেরি না করে এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা উঠে পড়লাম নৌকায়। যত দ্রুত সম্ভব এলাকায় ফিরবো, হানাদার মুক্ত করবো নিজ এলাকা। যারা এক সঙ্গে নিজ এলাকায় রওনা হলাম তারা হলো, আমি, আশরাফুল ইসলাম জগলু চৌধুরী (বাহুকা এলাকা), আলতাব, দুলাল, শহীদুল, মতি [জয়কৃষ্ণপাড়া এলাকা], শাজাহান আলী কালু (বাহুকা), তোজাম (কেছুয়াহাটা)।
 
১৩ ডিসেম্বর সকাল বেলায়-ই নামলাম যমুনা তীর কেছুয়াহাটায়। কারণ, আমাদের সঙ্গে থাকা তোজামের বাড়ি সে গ্রামে। দু’দিন ধরে নাওয়াখাওয়া ঠিক নেই। এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কেও জানা দরকার। তাই তোজামের বাড়িতে গেলাম সবাই। তোজামকে ফিরে পেয়ে গ্রামের সবাই খুব খুশি। সেখানে খবর পেলাম, আমির হোসেন ভুলু সিরাজগঞ্জ মুক্ত করতে শহরের দিকে এগিয়ে গেছেন। এফএফ মুক্তিযোদ্ধারা তার সঙ্গে আছে। সকল মুক্তিযোদ্ধাকেই তিনি সিরাজগঞ্জ শহরের দিকে এগিয়ে যেতে বলেছেন। তোজামের বাড়ির লোকজন ততক্ষণে আমাদের খাওয়ার আয়োজন করেছেন, কিন্তু না খেয়েই আমরা ছুটলাম সিরাজগঞ্জের দিকে।
 
ব্রাহ্মণবয়ড়া পর্যন্ত আসতেই নানা কথা শোনা গেলো। এলাকায় নানা গুজব ছড়াতে লাগলো যে, বয়ড়া-বাহিরগোলা রেল লাইনের ধারে তুমুল যুদ্ধ হয়েছে আমির ভাইয়ের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাক-সেনাদের। সেখানে নাকি অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। আমির ভাই নিজেও অসুস্থ হয়ে খোকসাবাড়ি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খবর ছিল যে, পাক-সেনারা শৈলাবাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে, তারা সিরাজগঞ্জ থেকেও চলে গেছে। কিন্তু রেল লাইনের ওপরে বাঙ্কার করে পাক-সেনারা তখনো ছিল, তা মুক্তিযোদ্ধারা বুঝতে পারেনি। সেখান থেকে নাকি একজন মুক্তিযোদ্ধাকে পাকিস্তানিরা ধরেও নিয়ে গেছে।
 
জানা গেল, সেখানে শহীদ হয়েছেন অন্তত ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মরদেহ যার যার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আহসান হাবীবের মরদেহ করব দিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তার বাড়িতে। আমরাও ছুটলাম সেখানে। বিপুল মুক্তিযোদ্ধা-জনতার উপস্থিতিতে যথাযোগ্য মর্যাদায় কবরস্থ করা হলো বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আহ মরদেহ।
 
পরদিন জানা গেল যে, রাতেই সিরাজগঞ্জ থেকে পাক-সেনারা পালিয়ে গেছে ঈশ্বরদীর দিকে। আমরা দলবল নিয়ে জনতার মিছিলের সঙ্গে ছুটলাম শহরের দিকে। বীরদর্পে সিরাজগঞ্জ শহরে ঢুকে পড়লাম আমরা মুক্তিযোদ্ধা-জনতা। এফএফ মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্প করে বসলাম ভিক্টোরিয়া হাই স্কুলে। অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন স্কুল-কলেজে, জুট মিল, স্পিনিং মিল ছাড়াও বিভিন্ন পরিত্যাক্ত বাসাবাড়িতে।

পাকিস্তানি প্রশাসনে কর্মরত পুলিশ, রাজাকার ও সরকারি কর্মচারীরা হয় পালিয়ে গেছে অথবা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে লুকিয়ে আছে। এ ভাবেই ভেঙে পড়েছে পাকিস্তানি প্রশাসন। সেখানে চালু করা হলো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশাসন। সে প্রশাসনে বিভিন্নভাবে আমাদের কাজ করানো হতে লাগলো। এক সময় ভিক্টোরিয়া স্কুলে স্থান সংকুলান না হওয়ায় আমাদের জায়গা করে দেওয়া হলো জ্ঞানদায়িনী হাই স্কুলে। 

প্রবাসী সরকার ফিরে এলো ঢাকায়, তাদের পক্ষ থেকে চালু হলো প্রশাসন, নিউ মার্কেটে স্থাপন করা হলো মিলিশিয়া ক্যাম্প। বিভিন্ন চাকরিতে যোগদানের জন্য আমাদের বলা হলো, মিলিশিয়া ক্যাম্পে যোগদানের জন্য, কিন্তু আমরা তো তখনো ছাত্র, আর ততদিনে খুলে ফেলছে স্কুল-কলেজ।  আমি স্কুলে ফিরে যেতে জ্ঞানদায়িনী স্কুলের ক্যাম্প থেকে বিদায় নিলাম জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে।

[ চলবে....]

মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন বানুর মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতি অবলম্বনে

অনুলিখন: সাইফুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা।  

অআই

ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে শত্রুবধের অভিযান

[দ্বিতীয় পর্ব]

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি চমৎকার গ্রাম নতুন বন্দর। গ্রামের সামনে দিয়ে সীমান্ত থেকে রৌমারীর দিকে চলে গেছে হেরিংবোন করা সড়ক। সে সড়কের পাশে গ্রামের প্রাইমারি স্কুল, স্কুলের সামনে বিশাল মাঠ। স্কুলের পুব পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি ছোট্ট নদী। সে স্কুলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। কিন্তু ১ শ’ ৪ জনের স্থান সংকুলান হলো না স্কুল ঘরে, পরে কয়েকটি তাঁবুরও ব্যবস্থা হলো, তাঁবু গাড়া হলো স্কুলের মাঠের মধ্যে। অবরুদ্ধ এলাকা থেকে মুক্ত এলাকায় এসে থাকার জায়গা পেয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত হলাম আমরা সবাই। এখন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হবেই। বিশেষ করে যখন আমাদের নেতা মোতাহার হোসেন তালুকদারকে পাওয়া গেছে। সেদিনের খাওয়া অবশ্য যার যার ট্যাঁকের পয়সা খরচ করেই করতে হয়েছিল। 

রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যাই সবাই, কেউ স্কুল ঘরের মধ্যে, কেউবা স্কুল মাঠের মধ্যে তাঁবুতে। কিন্তু রাতেই হঠাৎ বিপত্তি বাঁধলো। তা হলো, পাহাড়ি বন্যায় হঠাৎ প্লাবিত হলো এলাকা। আমরা যারা স্কুল ঘরে ঠাঁই পেয়েছিলাম, তাদের কোনও অসুবিধা হলো না, বিপদে পড়লো যারা ঠাঁই নিয়েছিল তাঁবুতে। মাঠে মধ্যে পানিতে টইটুম্বুর হয়ে তা তাঁবুতে ঢুকে পড়লো। এমন হঠাৎ বন্যার মোকাবেলা আমরা কোনও দিনও করিনি। ফলে যারা তাঁবুতে ছিল তাদের কাপড়চোপর বা সঙ্গে যাই ছিল, সবই ভিজে চুপচুপে হয়ে গেল। তারা সারারাত ঘুমাতে পারলো না। পরের দিন সকালে তালুকদার সাহেব আরো কয়েক জনকে সঙ্গে নিয়ে এলেন, আমাদের দুরবস্থা দেখে আবার নতুন আশ্রয়ের খোঁজ করলেন। আমাদের ব্যবস্থা হলো, পাকিস্তানি পুলিশদের পালিয়ে যাওয়ায় পরিত্যক্ত রৌমারী থানায়। আমাদের সে থানায় গিয়ে ওঠার আগে পর্যন্ত থানাটিতে কেউ থাকতো না, কর্মরতরা সবাই হয় পালিয়ে বাড়িতে চলে গিয়েছিল অথবা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। 

আমরা গেলাম রৌমারী থানায়, শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধে বিশাল অবদান রাখার রৌমারী ক্যাম্প। প্রথমে আমাদের সিরাজগঞ্জের আমাদের ১ শ’ ৪ জন নিয়ে শুরু হলো বলে এ ক্যাম্প নিয়ে আমরা গর্বিত। খুব দ্রুতই ক্যাম্প মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে ভরে উঠলো। তবে, শুরুতে যে কোনও বিষয়ই থাকে অব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত পর্যায়ে, এখানেও তাই ছিল। খাদ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন, মোতাহার হোসেন তালুকদারের বড় ভাইয়ের ছেলে, জহুরুল ইসলাম তালুকদার, তিনি সিরাজগঞ্জ মুকুল ফৌজের সংগঠক ছিলেন। রান্নার দায়িত্ব পালন করতেন এসডিও অফিসের গাড়িচালক নুরু ভাই। খাবারের অব্যবস্থাপনাই ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঠিকমতো সরবরাহ না থাকায় নিয়মিত রান্নাই হতো না, ফলে আমরা ক্ষেপে যেতাম নুরু ভাইয়ের ওপরে। দিনে এক বেলা তো দূরের কথা, সপ্তাহে তিন/চার দিন খাবার জুটতো কিনা সন্দেহ। খাবার না পেয়ে আমরা ক্ষেপে যেতাম নুরু ভাইয়ের ওপরে, কিন্তু তার সহ্য ক্ষমতা দারুণ, তিনি কখনো আমাদের ওপর রাগ করতেন না, বোঝানোর চেষ্টা করতেন তার অসহায়ত্ব। তারপরেও প্রতিনিয়ত সে ক্যাম্পে শরীর চর্চা হতো, এটা করাতেন চিলগাছার কামাল ভাই, তাকে আমরা মিলিটারি কামাল বলে জানতাম। 

শুরুটা যত কষ্টই হোক, আমাদের একটা সৌভাগ্য যে, হায়ার ট্রেনিংয়ের রিক্রুটের একটি টিম চলে এলো মাত্র ১৫ দিনের মধ্যেই। ফলে ইয়ুথ ক্যাম্পের ভোগান্তি কম ভুগেই আমরা গেলাম মূল প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। এখন শুধু স্বপ্ন দেখা, কবে প্রশিক্ষণ শেষ হবে, অস্ত্র তুলে দেবে আমাদের হাতে, আমরা এলাকায় ফিরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হননে মেতে উঠবো। আমাদের শপথ বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, দেশকে শত্রুমুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। আমরা আরো শপথ নিতাম স্বাধীনতা অথবা মৃত্যুর। 

আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো দার্জিলিয়ের মুক্তিনালা মুজিব ক্যাম্পে। এটি ভারতের একটি ক্যান্টনমেন্টের পাশে অবস্থিত। এ ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন প্রিন্স চৌহান, মেজর র‌্যাঙ্কের। প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন প্রেমাংশু। এখানে শুধু আমরাই নই, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার শত শত তরুণ এসেছে প্রশিক্ষণ নিতে। এখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শর্ট কোর্সের একটা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হয়। তাতে অংশ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছেলে শেখ কামালও। যাই হোক, সেকশন, প্লাটুনে ভাগ করে প্রতিদিন সকালে প্যারেড-পিটি, তারপর নাস্তা, তারপর আবার অস্ত্র প্রশিক্ষণ, দুপুরের খাবার, একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার অস্ত্র প্রশিক্ষণ। এতে আমরা যারা একই এলাকায় এক জোট ছিলাম, তারা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলাম। আমাদের দলে আমরা কয়েকজন রয়ে গেলাম এক সাথে। যারা এক সঙ্গে রয়ে গেলাম তারা হলাম আশরাফুল ইসলাম জগলু চৌধুরী [বাহুকা], আলতাব [বাহুকা], দুলাল [বাহুকা], মতি [জয়কৃষ্ণপাড়া], শাজাহান আলী কালু [বাহুকা], শহীদুল ইসলাম [বাহুকা], আমির হোসেন [বেতুয়া], হাসেম [বাহুকা], তোজাম [কেছুয়াহাটা]।

আমাদের ধারণা ছিল প্রশিক্ষণ শেষে অস্ত্র, প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ দিয়ে পাঠানো হবে নিজ এলাকায়, কিন্তু তা পাঠানো হলো না, আমাদের পাঠানো হলো রংপুরের হাতীবান্ধা সীমান্ত এলাকায়। 

আমরা ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল। আমাদের মূলত থাকতে হতো বাংলাদেশের সীমান্তের ভিতরে, কোথাও মুক্ত এলাকা, কোথাও অবরুদ্ধ এলাকা। মুক্ত এলাকায় থাকলেও পাক-হানাদার বাহিনীর দখল করা এলাকায়, স্বাধীনতাবিরোধী ও পাক-হানাদার বাহিনীর ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে ফিরে আসতে হতো আশ্রয়ে, যাকে আমরা ‘হাইড’ বা লুকিয়ে থাকার জায়গা বলতাম। এভাবে আক্রমণ করার কারণ পাক-বাহিনী যেন মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে সব সময়। সুযোগ পেলে দিনে অথবা রাতে আমরা এসব হামলা চালাতাম। আমরা সাধারণত ছোট ছোট গ্রুপে এসব হামলা চালাতাম। কিছুক্ষণ গোলাগুলি করেই আবার ফিরে আসতাম নিরাপদ আশ্রয়ে। এসব আশ্রয়কে আমরা বলতাম হাইড বা পালিয়ে থাকার স্থান। আমাদের এসব হামলায় সহযোগিতা করতো রাস্তাঘাট চেনা স্থানীয় গাইডেরা। তারাই পথ দেখিয়ে অপারেশনে নিয়ে যেত, আবার নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে নিয়ে আসতো। আর আমাদের সকল কর্মকাণ্ডকে পরিচালনা করতেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ। অসুখ-বিসুখ হলে চিকিৎসার জন্য তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হতো বিএসএফ ক্যাম্পে, সেখান থেকে ভারতের ভিতরের কোনও হাসপাতালে। আমাদের খাবারের ব্যবস্থা, হাত খরচের টাকা-পয়সা দেওয়া হতো বিএসএফ থেকেই। আমরা অপারেশন করতাম প্রধানত রংপুর এলাকার হাতীবান্ধা, বড়খাদা, সিংড়িমারী, বাওরা, ডিমলা এলাকায়। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আমাদের প্রায় তিরিশটি ছোটবড় অপারেশনে অংশ নিতে হয়েছে। তবে টুনির হাট যুদ্ধের কথা কোনও দিনও ভুলবার নয়।
নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়, শীতের কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে প্রায় সারাদিন। চার হাত দূরের মানুষকে দেখা যায় না। এতে এক দিকে সুবিধা, পাক-হানাদার বাহিনী সহজে আমাদের দেখতে পায় না। আবার সেটাই কখনো কখনো সমস্যা হয়ে দেখা দেয়, কারণ আমরাও তাদের দেখতে পাই না। সেদিনের এমনি এক বিপদে আমাদের পড়তে হয়েছিল টুনিরহাট পাক-সেনা ক্যাম্পে হানা দিতে গিয়ে। স্থানীয় গাইড এসে জানালো যে, টুনিরহাটে জনা তিরিশেক পাক-সেনা অবস্থান করছে, রাজাকারও আছে ২০/২৫ জন। এলাকার মানুষ তাদের অত্যাচারে অতিষ্ট। এলাকাবাসী চায় যে, ওই পাক-সেনা ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধারা হামলা করে তাদের তাড়িয়ে দিক। আমরাও সিদ্ধান্ত নিলাম, টুনিরহাট পাকিস্তানি ক্যাম্পে হানা দেবো, আধা ঘন্টা গোলাগুলি করে আবার ফিরে আসবো হাইডে অর্থাৎ নিরাপদ আশ্রয়ে। প্রস্তুত হলাম আমরা জনা তিরিশেক মুক্তিযোদ্ধা। রওনা দিলাম গভীর রাতে। 

[ চলবে....]

মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন বানুর মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতি অবলম্বনে

অনুলিখন: সাইফুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা-লেখক।

এসএ/

প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে ভারত যাত্রা

[প্রথম পর্ব]

ঊনসত্তরের ছাত্র আন্দোলন জনগণের মধ্যে ছাত্রদের একটি ভিন্ন ধরণের ভাবমূর্তি গড়ে তোলে। জনগণ মনে করতে থাকে যে, ছাত্ররাই তদের রক্ষাকর্তা। ফলে জনগণ যেখানে অন্যায় সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ছাত্রদের উস্কে দিতে থাকে। ছাত্রদের দ্বারা এমনি এক সামাজিক অনাচার বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সাহসী হয়ে উঠি। হয়ে উঠি অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী। 

আমি মোফাজ্জল হোসেন বানু, জন্ম: ১৯৫৬ সালের ১৮ মার্চ। পিতা: বাহারুদ্দিন সরকার, তিনি কৃষিকাজ করতেন। মাতা: সাহেরা খাতুন গৃহিণী। আমরা ৩ ভাই ২ বোন। ভাইবোনের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। গ্রাম: মেছড়া মল্লিকপাড়া, ইউনিয়ন: মেছড়া, থানা: সিরাজগঞ্জ সদর। 

১৯৭১ সালে আমি কাজীপুর থানার সোনামুখী ইউনিয়নের হরিনাথপুর হাই স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থী। বাড়ি থেকে স্কুল অনেক দূরে হওয়ায় আমাকে জায়গীর থাকতে হতো স্কুলের পাশের বাঘবেড় গ্রামে। আমি যখন নবম শ্রেণির ছাত্র তখন ছাত্রলীগ নেতা মেছড়ার বাছেদ ভাইসহ আরো কয়েক জন ছাত্রলীগ নেতা যান হরিনাথপুর হাই স্কুলে ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের উদ্দেশ্যে। সেদিনই আমি ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ি। 

যুক্ত হই ঊনসত্তরের ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলনে। এ সময়ে গ্রামের স্কুলগুলোতেও নিয়মিত মিছিল হতো, সে মিছিল প্রদক্ষিণ করতো আশপাশের গ্রামগুলো। তখন বাঙালিরা প্রচন্ড আইয়ুব বিরোধী হয়ে উঠেছিল। ফলে ছাত্ররা হয়ে ওঠে জনগণের নয়নের মনি। এ সময় বিডি মেম্বর চেয়ারম্যানদের বিরুদ্ধেও তাদের গম চুরির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে ছাত্ররা। সে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে গ্রামের টাউট বাটপারদের বিরুদ্ধেও। 

এমনি একটি বড় ঘটনা ঘটে কাজীপুর থানার সোনামুখী ইউনিয়নের বাঘবেড় গ্রামে। সে গ্রামের কতিপয় মানুষ ধর্মের নামে মজমা বসাতে একটি পাড়ায়। সেখানে গাঁজা-ভাঙ সেবন, মাতলামীতো চলতোই, তাছাড়াও নারীদের ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এরা প্রচলিত সামাজিক নিয়মকানুন মানতো না। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল চুরি-ডাকাতি। এদের কয়েকটি পরিবারের ওপর গ্রামের সাধারণ মানুষ ভীষন ক্ষুদ্ধ। তারা ওই সমাজ বিরোধীদের বিরুদ্ধে ছাত্রদের উস্কে দিতে থাকে। 

আমরা হরিনাথপুর হাই স্কুলের ছাত্ররা একদিন সে গ্রামের দিকে মিছিল নিয়ে যাই, উদ্দেশ্য ওই সব সমাজ বিরোধীদের সমাজ থেকে উচ্ছেদ করা। সে মিছিলে যোগ দেয় বিভিন্ন গ্রামের মানুষও। বাঘবেড়ের সেই সমাজ বিরোধীদের ওপর মিছিল থেকে হামলা চালানো হয়। সেদিন ওই সব সমাজ বিরোধীদের অনেকের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়, গণপিটুনিতে মারা যায় অন্তত ৭ জন সমাজ বিরোধী। স্বাভাবিক ভাবেই উদ্যোক্তা ছাত্রদের কাঁধেই এর দায়ভাব চেপে বসে। 

এর ক’দিন পরেই আসে ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসন। চারদিকে গুজব ছড়াতে থাকে যে, এখন ছাত্রদের ধরে জেলের ভাত খাওয়াবে। আমাদের কয়েক জনকে স্কুলে যেতে বারণ করা হতে থাকে। আমরা হয়ে উঠি স্কুল পালানো ছাত্র। এভাবেই আমার স্কুলের সঙ্গে প্রকাশ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। শুরু হয় আত্মীয়-স্বজন, বন্ধবান্ধব আর নিজের বাড়িতে পালিয়ে থাকা। আর গোপনে যোগাযোগ রেখে স্কুলের খাতায় ছাত্র নামটি রাখা। এর মধ্যে আসে নির্বাচন। গ্রামে আওয়ামী লীগের কর্মীদের মতো ভোট চেয়ে বেড়াই। সে নির্বাচনে আমাদের গ্রামের কেন্দ্রেও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। সারাদেশের আওয়ামী লীগের বিজয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করি স্কুলে ফিরে যাওয়ার। এসএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলাপ করি সে স্বপ্ন থেকেই। 

১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকেই আবার পূর্ব বাংলা উত্তাল হয়ে ওঠে। আমরা ছাত্ররা স্বাধীনতার জন্য মাতম করতে শুরু করি। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হামলে পড়ে নিরীহ স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের ওপরে। এতে সারাদেশে বিদ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। আমরা ছাত্ররা তো আগে থেকেই বিদ্রোহী হয়ে উঠেছি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় দাদা এহসান উদ্দিন তালুকদার বললেন, ভালোই হলো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেহেতু রুখে দাঁড়াতে শুরু করেছিস, যা যুদ্ধে যা, পাকিস্তানিদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়া। 

সিরাজগঞ্জে হানাদার বাহিনী আসার পর পরই দল পাকাতে শুরু করলাম, ভারত যাবো, সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করবো, স্বাধীন করবো দেশ, যে দেশে কোনও অন্যায় থাকবে না। আমার মতোই অনেকেই এ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তখন। জুটে গেলাম সব এক সঙ্গে। নৌকাও ঠিক করা হয়ে গেল, মে মাসের মাঝামাঝি আমরা মোট ১০৪ জন বেতুয়া ঘাট থেকে সে নৌকায় উঠে পড়লাম। 

আমার সহযাত্রীদের মধ্যে এই মূহুর্তে যাদের নাম মনে পড়ছে তারা হলো- শুড়ি মেছড়া গ্রামের আবুল কালাম আজাদ, একই গ্রামের নুর ইসলাম, হায়দার আলী, বেতুয়া গ্রামের কাশু খাঁ, আমনমেহার গ্রামের জুলফিকার আলী ভুট্টো, একই গ্রামের আবু বকর, হায়দার আলী, নেহার আকতার, পাটগ্রামের সোলায়মান, কালাইচার হাপ্পা, শুভগাছার চান মিয়া, কাজীপুরের আবুল কালাম আজাদ, খাড়-য়া গ্রামের শহীদ আহসান হাবীব, বাহুকার আশরাফুল ইসলাম জগলু চৌধুরী, একই গ্রামের কালু, দুলাল, শহীদুল ইসলাম এবং চিলগাছা গ্রামের তারিকুল ইসলাম প্রমুখ। প্রায় দুই দিন যমুনা ব্রহ্মপুত্রের উজান ঠেলে পৌঁছে গেলাম রৌমারীর পাশের ভারতের আসাম প্রদেশের মাইনকারচরে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, সে ক্যাম্প খুঁজে পাবো কোথায়?

আমরা চিনতাম শুধু মোতাহার হোসেন তালুকদারকে। তিনি এবার পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য এমএনএ নির্বাচিত হয়েছেন। এলাকায়ই শুনে এসেছি যে তিনি ভারতে চলে এসেছেন। পরে তার পরিবারও চলে এসেছে এই মাইনকার চরে। সিদ্ধান্ত নিলাম তাকেই খুঁজে বের করার। আমাদের আগেই অনেকেই বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনেকে জীবন বাঁচাতে এখানে এসে ঠাঁই নিয়েছে। আমরা কয়েকজন নৌকা থেকে নেমে তাদের কাছে মোতাহার হোসেন তালুকদারের খবর নিতে শুরু করলাম। 

তাঁকে পেতে খুব একটা বেগ পেতে হলো না। মোতাহার হোসেন তালুকদারকে খুঁজে পেয়ে বললাম, আমরা এলাকা ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে এসেছি, আপনি আমাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। তিনি বাসা থেকে বের হয়ে সিরাজগঞ্জের আরো কয়েকজন ছাত্র ও যুবনেতাকে ডেকে আনলেন। তাদের সঙ্গে আমাদের পাঠিয়ে দিলেন, রৌমারীর পূব দিকের একটি গ্রাম নতুন বন্দরে।

[ চলবে....]
 
মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন বানুর যুদ্ধকালীন স্মৃতি অবলম্বনে
অনুলিখন: সাইফুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা-লেখক। 

 

-এম জে

জেল হোসেন মণ্ডলের যুদ্ধকথা

চাষাভুঁষা মানুষ আমি, নাম জেল হোসেন মণ্ডল। বাবার নাম ছাবেদ আলী মণ্ডল।

মায়ের নাম জেলা খাতুন। জন্ম ১৯৪৯ সালে। গ্রাম: তেলকুপি, ইউনিয়ন: খোকসাবাড়ি, জেলা: সিরাজগঞ্জ। 

আমাদের গ্রামটি সিরাজগঞ্জ শহরের একেবারে কাছেই। লেখাপড়া জানতাম না আমি, বাবা কৃষি কাজ করতেন। তাই আমাকেও কৃষিকাজেই যুক্ত হতে হয়। মাঠে যখন কাজ থাকতো না তখন রাজমিস্ত্রির জোগালের কাজও করতাম। আর জোগালের কাজ করতে গিয়ে ওই বয়সেই ঘুরে বেড়িয়েছি ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহর। আমার বয়স যখন মাত্র সতের বছর তখন অর্থাৎ ১৯৬৭ সালে আমার বাবা-মা আমাকে বিয়ে করান। আমার স্ত্রীর নাম শাহিদা খাতুন। 

১৯৬৯ সালে দেশে শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন। তখন আমাদের পাশের ধীতপুর আলাল গ্রামের মো. আলাউদ্দিন শেখ ছাত্রলীগ করতেন। তিনি মাঝেমধ্যেই আমাদের শহরে মিছিল করতে নিয়ে যেতেন, তাদের সংগঠনের কর্মী সভা হলেও যেতে বলতেন। আমরাও গ্রামের লেখাপড়া জানা বা না জানা তরুণেরা যেতাম, তবে রাজনীতির কিছু বুঝতাম না। মিছিল করতে ভালো লাগতো তাই যেতাম, মিছিলে দৃঢ় পায়ে হাঁটতে হাঁটলে মনে হতো দেশের জন্য কাজ করছি। এ ভাবেই লেখাপড়া না জানা সত্বেও জড়িয়ে পড়ি স্থানীয় ছাত্রলীগের সঙ্গে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আশপাশের গ্রামে দল বেঁধে আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে বেড়াই। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এমএনএ পদে মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং এমপিএ পদে সৈয়দ হায়দার আলী বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। দেখা যায়, আওয়ামী লীগের এ বিজয় শুধু সিরাজগঞ্জেই নয়, সারাদেশেই সম্ভব হয়েছে। মনে হতে থাকে, এ বিজয় যেন আওয়ামী লীগের নয়, এ বিজয় জনগণের। আমরা জনগণ আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই।
 
১৯৭১ সালের মার্চ পর্যন্ত আমরা ভেবেছিলাম বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অর্থাৎ বাঙালিরা পাকিস্তানের ক্ষমতা নেবে। কারণ বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগই পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। কিন্তু বাঙালিদের সে স্বপ্ন ভেঙে খান খান করে দেয় পাকিস্তানের সামরিক সরকার ইয়াহিয়া খানের ঘোষণা। ১ মার্চ সে ঘোষণা করে, ৩ মার্চের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়। জনগণ ভাবে, এটা পাকিস্তানিদের বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা না দেওয়ার ষড়যন্ত্র। আবার ক্ষেপে যায় ছাত্ররা। 

রাস্তায় রাস্তায় স্লোগান ওঠে, ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন, পাকিস্তানকে আর কোনও সহযোগিতা নয়। আবার গ্রাম থেকে মিছিল নিয়ে শহরে যাওয়া, গলা ফাটিয়ে স্লোগান তোলা, ছাত্রনেতাদের বক্তৃতার কথায় কথায় হাততালি দেওয়া শুরু হয়ে গেল আমাদের। সিরাজগঞ্জের এসডিও একে শামসুদ্দিনও আর এসডিপিও আনোয়ার উদ্দিন লস্কর প্রশাসন ছেড়ে নেমে এলেন জনতার মিছিলে। 

পঁচিশ মার্চের কালো রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হামলা চালায় নিরীহ বাঙালির ওপর। এ খবরে মিছিলের ঢল নামে শহরে। বিভিন্ন গ্রাম থেকে মিছিল যায় শহরে, আমাদের গ্রাম থেকেও মিছিল যায় শহর কাঁপাতে। যারা পাকিস্তানের পক্ষে ছিল তারাও বাঙালিদের আন্দোলনকে সমর্থন জানাতে শুরু করে। সিরাজগঞ্জে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কোন ক্যাম্প ছিল না, ফলে বিনা যুদ্ধে শুধু মিছিলে মিছিলেই মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ মহুকুমা। শুরু হয় সিরাজগঞ্জকে হানাদার মুক্ত রাখার তৎপরতা।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হামলায় আক্রান্ত বাঙালিরা ঢাকাসহ বিভিন্ন শহর থেকে নিঃস্ব হয়ে ঘরে ফিরতে শুরু করে। তাদের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের খবর ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেশের প্রত্যন্ত এলাকায়। ভীত হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। এদিকে, প্রচার হতে থাকে যে, যে কোনও দিন পাকিস্তানি মিলিটারিরা চলে আসবে সিরাজগঞ্জেও। এতে ভীতসন্ত্রস্থ সিরাজগঞ্জবাসী শহর থেকে আশ্রয়ের সন্ধানে ছোটে গ্রামের দিকে। আমাদের তেলকুপি গ্রাম শহরের লাগোয়া, আমরাও বাড়ির গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র মাটির নিচে পুঁতে রেখে বাড়ি ছাড়ি, চলে যাই প্রত্যন্ত গ্রামের দিকে। 

২৭ এপ্রিল ভোর রাতে ঈশ্বরদী ও সৈয়দপুরের অবাঙালিদের সঙ্গে নিয়ে পাক-বাহিনী ঢোকে সিরাজগঞ্জ শহরে। তারা এসেই অগ্নিসংযোগ, হত্যা, ধর্ষণের মধ্য দিয়ে সিরাজগঞ্জ শহর ও তার আশপাশ এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। ভষ্মিভূত হয় সিরাজগঞ্জ শহর। শহরতলীর আমাদের গ্রামের প্রায় সব বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বেশ কিছু নারী-পুরুষকেও হত্যা করাা হয় আমাদের গ্রামের মধ্যে। থমথমে হয়ে পড়ে সমগ্র এলাকা, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রনেতারা চলে যায় আত্মগোপনে। 

পাকিস্তান সেনাবাহিনী শহরে আসার পর তাদের সহযোগিতার পথ বেছে নেয় মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামীসহ পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিরা। আমাদের গ্রামের মুসলিম লীগ, জামায়াত কর্মীরাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সিরাজগঞ্জের এসডিও শামসুদ্দিন ও এসডিপিও আনোয়ার লস্কর শহর ছেড়ে চলে গেছেন তার আগেই। তাহলে পাকিস্তান কাকে দিয়ে চালাবে বেসামরিক প্রশাসন? প্রথমে দোয়াতবাড়ি গ্রামের জনৈক আলী ইমাম নামের এক অবাঙালি, তারপর মুসলিম লীগ নেতা তরিকুল ইসলাম লেবু মিয়াকে এসডিওর দায়িত্ব দিয়ে চালু করা হয় ভেঙে পড়া পাকিস্তানি প্রশাসন। 

তাদের সহযোগিতা করতে গঠন করা হয় শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী। মুসলিম লিগ, জামায়াত নেতাকর্মীদের প্ররোচনায় ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করে শহরের মানুষ। আমিও পরিবার-পরিজনের সাথে ফিরি নিজ গ্রামে, কিন্তু বাড়িতেও থাকি পালিয়ে পালিয়ে। চড়ার মধ্যে কাজ করি, পারতপক্ষে বাড়িতে আসি না, রাতে এসে খেয়েদেয়ে অন্য কোনও বাড়িতে গিয়ে থাকি।
  
এলাকার চেয়ারম্যান মেম্বাররা পাক-বাহিনীকে সহযোগিতার পথ বেছে নেয়। তারাও শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী গঠনে সহযোগিতা করতে শুরু করে। আমাদের গ্রামের মেম্বারের ওপর চাপ আসে রাজাকার বাহিনীতে তরুণদের নাম দেওয়ার জন্য। আমাদের এলাকার মেম্বার নামের লিস্ট দেওয়ার সময় আমার নামও ঢুকিয়ে দেয়। এক কান দু’কান করে একথা সহজেই জানাজানি হয়ে যায়। রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেওয়ার চাপে ভীত হয়ে পড়ি। একদিন গ্রামের মুরুব্বী ময়দান প্রামানিক আসেন আমার বাড়িতে। আলাদা করে বাইরে নিয়ে ফিস ফিস করে বলেন- তোর নামতো রাজাকার বাহিনীতে দিছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি- কী করবো, বুদ্ধি দেন, আপনে তো আমার মুরুব্বি। তিনি বলেন- গ্রাম ছেড়ে চলে যা, তাও রাজাকারে যাসনে। দরকার পড়লে মুক্তিযুদ্ধে যা, তোদের মতো জোয়ান মানুষ ঘরে বসে থেকে মার খাবি কেন, দেশের কাজে লেগে যা। তাকে বললাম- আমার হাতে তো একটা পয়সাও নেই, এ অবস্থায় কী করবো। তিনি তখন তার পকেট থেকে ১০ টাকা বের করে আমার হাতের মধ্যে গুঁজে দিলেন। বললেন- আমার দেওয়ার মতো এই আছে, তুই এলাকা ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে চলে যা। বাড়িতে ফিরে রাতে বউকে খোলাসা করে না বলে বল্লাম- মেম্বার সাব আমার নাম রাজাকার বাহিনীতে দিয়েছে, কিন্তু আমি যাব না সেখানে। আমার স্ত্রী আর কী বলবেন, তারও তো বলার কিছু নেই। আসলে তিনিও চান না যে, আমি রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেই। 
 
সকালে উঠে খেয়েদেয়ে কাউকে কিছু না বলে রওনা হলাম অজানার উদ্দেশ্যে। এক কাপড়েই রওনা হতে হলো, কারণ, বেশি কাপড় নিতে গেলে জানাজানি হবে। বাড়ি থেকে বের হয়ে ভাবলাম, ইন্ডিয়ায় যাব, যোগ দেব মুক্তিযুদ্ধে। অনেকের কাছেই শুনেছি যে, শুভগাছার যমুনার ঘাট থেকে প্রায় প্রতিদিনই নৌকা যাচ্ছে রৌমারী মাইনকার চরে। সেখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে মুক্তিযোদ্ধারা। রওনা হলাম সেদিকেই। পথেই দেখা, চন্দ্রকোনার আনোয়ার, খালেক, লুৎফর, টুম্পা, গোলামের সঙ্গে। ওরাও যাবে মুক্তিযুদ্ধে। ওদের পেয়ে সাহস আরো বেড়ে গেল। 

নৌকার মাঝির সঙ্গে মাইনকার চরে যাওয়ার ব্যাপারে কথা হলো। আমার কাছে পয়সা কম, তবুও নৌকার মাঝি নিতে রাজী হলো। শুভগাছা ঘাটেই দেখা রহমতগঞ্জের ইসমাইল আর জাকিরের সঙ্গে। ওদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে নৌকায় উঠতে যাবো, সে সময় বাঁধা দিলো ইসমাইল (রহমতগঞ্জ)। বলল যে, তোমার রৌমারীতে গিয়ে কোনও লাভ নেই, কারণ ওখানে কমপক্ষে ম্যাট্রিক পাশ ছেলেদেরই ট্রেনিংয়ে নেয়। সেখানে গেলে আবার ফিরেই আসতে হবে। ইসমাইলই ওসমান মাঝিকে দায়িত্ব দেয় আমার থাকার ব্যবস্থা করতে। আর ইসমাইল চলে যায় কয়েকজনকে রৌমারী পৌঁছে দিতে। আমি মাইনকার চর যেতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়ি। সেদিনের মতো থেকে যাই শুভগাছার ওসমান মাঝির বাড়িতেই।
 
শুভগাছা থেকে বাড়ির পথ মাত্র এক বেলার, কিন্তু বাড়িতে ফিরতে মন টানে না, কিন্তু যাবো কোথায়? এ আত্মীয় বাড়ি, ও বন্ধুর বাড়ি, আমিনপুর, ফুলকোচা ঘুরে ঘুরে তিন দিন পর ফিরে আসি বাড়িতেই। কিন্তু বাড়িতে থাকি না রাজাকার হওয়ার ভয়ে। সারাদিন চড়ার মধ্যে থাকি, ক্ষেতে কাজ করি, কারো সঙ্গে যেন দেখা না হয়, সেভাবেই চলাফেরা করি। রাতের অন্ধকারে চোরের মতো বাড়িতে ঢুকে চারটে খেয়ে আবার পালাই যাতে কেউ দেখতে না পায়। এ অবস্থায় খবর পাই যে, লতিফ মির্জা ভদ্রঘাটে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প খুলেছে। খবর পেয়েই  আমার চাচাতো ভাই কুদ্দুসকে সঙ্গে নিয়ে যাই ভদ্রঘাট। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারি যে, আগের দিনই অর্থাৎ ১৭ জুন লতিফ মির্জার বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর তুমুল যুদ্ধ হয়েছে। সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধারা সরে গেছে দূরে কোথাও। অল্পের জন্য মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া হলো না বলে হতাশ হয়ে আবার ফিরে আসি এলাকায়। আবারো বনেবাদারে ঘুরে বেড়াই, ক্ষেতে কাজ করি পালিয়ে পালিয়ে, আর রাতে গোপনে বাড়ি গিয়ে খেয়ে চলে আসি, অন্য কারো বাড়িতে রাত কাটাই।
 
একদিন দুপুরে চন্দ্রকোনার ক্ষেতে কাজ করছি, কুদ্দুস এসে জানায় যে, রৌমারী থেকে ফিরে এসেছে ইসমাইল, আমাকে দেখা করতে বলেছে। তখনই ইসমাইলের সঙ্গে দেখা করতে যাই কুদ্দুসকে সঙ্গে নিয়ে। ইসমাইল তখন বাড়িতেই, সে আমাকে একটি রাইফেল হাতে দিয়ে কুদ্দুসকে গুলি করতে বলে। আমি ভ্যাবচ্যাকা খেয়ে যাই, ইতস্তত করি। কুদ্দুসও বলে, কমান্ডার যখন বলছে, মার গুলি, দেখি তোর কত সাহস! আমিও রাইফেল হাতে তুলে নিই, তাক করি কুদ্দুসের দিকে। তখন ইসমাইল আমাকে ঠেকিয়ে দিয়ে বলে, ঠিক আছে তুই পারবি। আজ সন্ধ্যায় আসিস, অপারেশনে যাবো। আমি আর কুদ্দুস দু’জনেই তখনকার মতো চলে আসি।
 
সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সঠিক স্থানে পৌঁছে যাই। সেখানে আমার মতোই জড় হয় আরো ১৪/১৫ জন। আসে ইসমাইলও। তার কথা মতো, উত্তর দিকে রওনা দেই সবাই, কিন্তু কোথায় যাচ্ছি তা জানি না। যেতে যেতে পৌঁছে যাই কেচুয়াহাটা গ্রামে। আমাদের কয়েক জনকে গ্রামের বাইরে রেখে অন্যরা গ্রামে ঢুকে পড়ে। সেখানে এক ডাকাতকে ধরা হয়। তার কাছে থেকে উদ্ধার করা হয় তিনটি রাইফেল আর বেশ কয়েকটি গুলি। ডাকাতকে ছেড়ে দিয়ে আমরা সবাই আবার ফিরে আসি এলাকায়। সারাদিন গ্রামের আশেপাশে থাকি। আবার সন্ধ্যায় একত্রিত হই। এ ভাবে চলতে চলতে আসে বর্ষাকাল। নদীনালা, খালবিল ভরে ওঠে বর্ষার পানিতে। তখন একটি নৌকা ঠিক করা হয়। ইসমাইলের নেতৃত্বে আমরা প্রায় ২৫ জনের মুক্তিযোদ্ধা উঠে পড়ি নৌকায়। আজ বেলকুচি তো কাল চলে আসি কামারখন্দ এলাকায়। কখনো বা বাগবাটী রতনকান্দি অঞ্চলে। 

রতনকান্দির শ্যামপুর গ্রাম থেকে একদিন আমরা রওনা হলাম চক ডাকাতিয়া নদী হয়ে। সেখানে লতিফ মির্জার পলাশডাঙ্গা বাহিনী অবস্থান করছিল। আমরা সেখানে ঢুকতেই আমাদের ‘হল্ট’ করতে বলা হলো। আমরা হাত উপরে তুলে পরিচয় দিলাম। তখন আমাদের সে এলাকায় ঢুকতে দেওয়া হলো। আলোচনা শেষে আমাদের ইসমাইল বাহিনী মিশে গেল পলাশডাঙ্গায়।
 
ইসমাইলের নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হলো দু’টি নৌকা- ৯-এ ও ৯-বি। আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লুৎফর রহমান অরুণের নৌকায়। অরুণদা বললেন- তুমি আমার বডিগার্ড। কিন্তু তখনো জানিনা বডিগার্ড কথার মানে কী? অরুণদা বুঝিয়ে বললেন, সব সময় আমার সাথে সাথে থাকবি, আমি যেখানে যাই, সেখানে যাবি, যা করতে বলি করবি। সেদিন থেকেই অরুণদার ছায়াসঙ্গী হয়ে পড়ি। ধীরে ধীরে লেখাপড়া জানা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে চলতে চলতে বুঝতে পারি যে বডিগার্ড মানে দেহরক্ষী। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে লুৎফর রহমান অরুণের বডিগার্ড হতে পারাটা আমার জন্য বিরাট গর্বের, কারণ তিনি ছিলেন পলাশডাঙ্গার কমান্ডার, তার স্নেহ ছায়াতলে থাকার কারণেই পলাশডাঙ্গার সকল মুক্তিযোদ্ধার কাছে আলাদা খাতির-সন্মান পেয়েছি। তার অংশ নেওয়া সকল যুদ্ধেই আমাকে অংশ নিতে হয়েছে। সে সব যুদ্ধের কথা অনেকেই লিখেছেন, অনেকে লিখবেন, আর বড় মানুষেরা যখন যুদ্ধের কথা বলবেন, তখন তাদের যুদ্ধকথাই সবাই শুনবেন। তাই যুদ্ধ আলোচনার চেয়ে অন্য কথা বলাই ভালো বলে মনে হয়।
 
পলাশডাঙ্গার তখন অনেকগুলো নৌকা, পঞ্চাশটির কম নয়। সবগুলো নৌকা কাছাকাছি একটি বড় গ্রাম বা কয়েকটি ছোট ছোট গ্রামের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতো। সকালে সবার জন্য প্রতিদিন বরাদ্দ করা পাঁচ সিকা করে ব্যাটালিয়নের নৌকা থেকে নিয়ে আসতে হতো। টাকা বিতরণ করতেন পলাশডাঙ্গার ক্যাসিয়ার রতনকান্দির চিলগাছা গ্রামের আব্দুল হাই তালুকদার। নৌকার যে কোনও একজন বাজার করে আনতো। বাজার শেষে যদি কিছু থাকতো তবে তার ভাগ ফেরত পেতাম। কেউ বিড়ি খেতো, কেউ সিগারেট, তাও আনতে হতো বাজার থেকে। সন্ধ্যার আগেই খাওয়াদাওয়া শেষ করতে হতো, কারণ রাতে নৌকায় বাতি জ্বালানো নিষেধ। সন্ধ্যায় নৌকায় মুক্তিযোদ্ধাদের হাজিরা নেওয়া হতো। তারপর নৌকা গণনা হতো। তারপর আগের দিনের আশ্রয় ছেড়ে চলে যেতে হতো নতুন আশ্রয়ে।
 
রোজার প্রথম দিন। আমরা হান্ডিয়াল-নওগাঁ অঞ্চলে নোঙর করে আছি। প্রায় সবাই রোজা রয়েছে, নৌকায় নৌকায় সেদিন বিশেষ বাজারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। বিকেলের দিকেই ইসমাইলের নৌকা থেকে দাওয়াত দিয়ে গেল যে, আমরা ইসমাইল বাহিনীতে যারা ছিলাম, তারা সবাই এক সঙ্গে ইফতার করবো। এ ব্যাপারে অরুণদাকে বলতেই তিনি যেতে নিষেধ করলেন। ইফতারের আগে আগে আবারো খবর এলো, ইসমাইলের নৌকায় ইফতার করার জন্য। এবারো অরুণ দা নিষেধ করে বললেন, আমরাও তো এক সঙ্গে ইফতার করবো, নিজের দলের সঙ্গেই রোজার প্রথম ইফতার করা দরকার। মনে হলে ইফতারের পরে গিয়ে দেখা করে এসো। আমার আর ইসমাইলের নৌকায় ইফতার করতে যাওয়া হলো না। 

ইফতার ও রাতের খাওয়া শেষে এবার এ আশ্রয় ছেড়ে অন্য আশ্রয়ে যাওয়ার পালা, তার আগে মুক্তিযোদ্ধা হাজিরা, নৌকার হাজিরা। নৌকার হাজিরা দেখতে গিয়ে পাওয়া গেল যে, ৯-এ আর ৯-বি অনুপস্থিত। নেই ইসমাইলের নৌকা। সে দুই নৌকার মুক্তিযোদ্ধারাও নেই। তার মানে, ইসমাইলরা পলাশডাঙ্গা ছেড়ে চলে গেছে। পরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেল যে , ইসমাইলের সঙ্গে পলাশডাঙ্গায় আসা সবাইকে এভাবে ইফতারের কথা বলে গোছানো হয়েছে। প্রায় সবাই সে ইফতার করতে গিয়ে চলেও গেছে ইসমাইলের সঙ্গে। বুঝতে পারলাম, কেন ইসমাইলের নৌকায় ইফতার করার জন্য আমাকে টানা হেঁচড়া করছিল। আবার স্পষ্ট করে বলেনি যে, যদি তাদের পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়! আমি মনে মনে আল্লাহকে ধন্যবাদ দেই যে, ইসমাইলের নৌকায় ইফতার করতে না গিয়ে ভালোই হয়েছে। ইসমাইল যাই চেষ্টা করুক অথবা আমার পুরনো সহযোদ্ধারা থাকুক, একটা বড় বাহিনী ছেড়ে আমাকে চলে যেতে হয়নি।
 
১১ নভেম্বর বড় ধরণের আঘাত আসে পলাশডাঙ্গার ওপর, আমরা সেদিন আশ্রয় নিয়েছি হাণ্ডিয়াল-নওগাঁ এলাকায় জিন্দান শাহর মাজার ঘিরে, ঘাটে ঘাটে নৌকা বাঁধা আছে। ভোর রাতের দিকে বোঝা গেল যে, পাকিস্তানি সৈন্য ও তার সহযোগিরা আমাদের ঘিরে ফেলেছে। কিন্তু ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়েও ঘাবড়ে যাইনি আমরা। যার যার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন স্থানে পজিশন নেই, শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। সে যুদ্ধ চলে পরদিন দুপুর পর্যন্ত। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী হয়তো ভেবেছিলো যে, দু’তিন ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের পরাজিত করতে পারবে, কিন্তু আমরাও মাটি কামড়ে পড়ে থাকি। ধীরে ধীরে পাকিস্তানিরা ঘাবড়ে যেতে থাকে। সময় যত গড়ায়, পাকিস্তানিরা কাঁদা-প্যাঁকে আটকা পড়তে থাকে। বুট জুতা, জামাকাপড়, অস্ত্রশস্ত্র চলনবিলের কাঁদামাটিতে ভিজে তা ভারি হয়ে উঠতে শুরু করে। সময় যত গড়াতে থাকে, এলাকার মানুষজনেরও সাহস বাড়তে থাকে। তারাও ঘিরে ধরতে শুরু করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তার সহযোগিদের। দুপুরের দিকেই আমাদের বিজয় নিশ্চিত হয়, পাকিস্তানিরা পালানোর পথ খুঁজতে থাকে। এক সময় তারা অস্ত্রশস্ত্র ফেলে পালাতে শুরু করে। এ পরিস্থিতিতে জনগণও তাদের ইচ্ছেমতো মারপিট শুরু করে। মেয়েরা পর্যন্ত তাদের ঘষির মাঁচা থেকে ধরে এনে আমাদের কাছে জমা দিতে থাকে অস্ত্রগুলি সহ। এ ভাবেই বিজয়ী হই আমরা পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধারা। 

একজন ক্যাপ্টেন সহ অন্তত ১২ জন ধরা পড়ে, আর মারা পড়ে এক কোম্পানি পাকিস্তানি সৈন্য, শতাধিক রাজাকার। আমাদের কেউ শহীদ হননি। তবে, জামতৈলের কাঞ্চু, মধু নাইন্নার সালামসহ ৪ মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। যুদ্ধ শেষে দেখা গেল, বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা পলাশডাঙ্গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ বিজয় পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধাদের আরো আত্মবিশ্বাসী করে তোলে, কিন্তু যুদ্ধের কৌশল পাল্টানোর প্রয়োজন পড়ে। 

কমান্ডাররা নৌকা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, কারণ তখন বন্যা আর নেই, সংকুচিত হয়ে এসেছে চলনবিলের পানিবহুল এলাকাও। হান্ডিয়াল-নওগাঁ এলাকা ছেড়ে আপাতত অন্য চলে যাওয়ার ব্যপারেও ভাবনা চিন্তা শুরু হয়। এর দু’দিন পরেই আমরা গুরুদাসপুর এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু সে এলাকায় পাকিস্তানি মিলিটারি ও রাজাকারদের চাপ বেড়ে যাওয়ায় ওদিকে যাওয়া হয় না। বগুড়ার দিকেও একই অবস্থা। মোহনপুরের দিকেও যাওয়া সম্ভব হয় না। নাটোরের তালম এলাকায় সরে যাই আমরা। ওই এলাকার রাণীরহাট গ্রামে আমাদের রোজার ঈদ পার হয়। আবার ফিরে আসি পরিচিত এলাকার দিকে। নিমগাছীর দিকে এসে সেখানকার চেয়ারম্যানের কাছে আশ্রয়ের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিলে তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেবে বলে তারা কান্নাকাটি করতে শুরু করে। তখন আমাদের দল বগুড়ার ধুনুট হয়ে কাজীপুর-রতনকান্দির দিকে সরে যাওয়ার চিন্তা করে। আমরা বগুড়ার চান্দাইকোনা বাজার হয়ে ধুনুটের মধ্যে ঢুকে পড়ি। কমান্ডারেরা সিদ্ধান্ত নেয় কয়েকদিন এলাকা ছেড়ে থাকার। এজন্য তারা সিদ্ধান্ত নেয় মুক্ত এলাকা নিরাপদ আশ্রয় মাইনকারচর হয়ে রৌমারী যাওয়ার। আমরা চলে আসি ব্রহ্মগাছার পাশ্ববর্তী চকডাকাতিয়া গ্রামে।

নওগাঁ যুদ্ধের আগের দিন পলাশডাঙ্গা থেকে কয়েক জন মুক্তিযোদ্ধা ছুটি নিয়ে বাড়িতে গেছে বাবামায়ের সঙ্গে দেখা করতে। এলাকা ছাড়ার আগেই তাদের বাহিনীতে নিয়ে আসতে হবে, এজন্য আমাকে পাঠানো হয় আমার এলাকায়। হয়তো এ ভাবেই অন্য এলাকায় আরো কাউকে পাঠানো হয়। আমি চন্দ্রকোনা থেকে ইনসাফ, খায়ের ও গোলামকে খুঁজে বের করি এবং যুদ্ধের খবরাখবর ও বাহিনীর সিদ্ধান্ত জানাই। ওরা সঙ্গে সঙ্গেই রওনা হই। এর পর আমি খোকসাবাড়ীতে যাই আব্দুল হাইকে খুঁজতে। ওর বাড়ি গিয়ে জানতে পারি যে আব্দুল হাই রৌমারীতে চলে গেছে। আমি রতনকান্দির ক্ষুদ্রবয়ড়া গ্রামে এসে পলাশডাঙ্গার সঙ্গে যুক্ত হই। সেখানে জানতে পারি যে, এ কয়দিনে কমান্ডারেরা নৌকা ঠিক করে রেখেছে রৌমারীতে যাওয়ার জন্য। পরের দিন আমরা পলাশডাঙ্গার সবাই মেছড়ার যমুনার ঘাট থেকে উঠে পড়ি রৌমারীর উদ্দেশ্যে। নানা বাধাবিপত্তি পেরিয়ে তিন/চার দিনে অর্থাৎ নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমরা পৌঁছে যাই বাংলাদেশের অন্যতম মুক্ত এলাকা কুড়িগ্রামের রৌমারীতে। সেখানে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়। আমাদের ছেড়ে নেতারা ছোটেন কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও পরবর্তী নির্দেশনার জন্য।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে শুরু হয় আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্ব। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ও ভারতীয় সেনাবাহিনী যুক্ত হয়ে গঠন করা হয় মিত্র বাহিনী। তারা বিভিন্ন দিক থেকে ঢুকে পড়ে বাংলাদেশের মধ্যে। ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তান বাহিনীর জেনারেল নিয়াজি। বিজয়ী হয় মুক্তিযুদ্ধ। এর দু’তিন দিনের মধ্যে পলাশডাঙ্গার নেতৃবৃন্দ, যারা বিভিন্ন স্থানে গিয়েছিলেন যোগাযোগ করতে, তারা ফিরে আসেন। আমরাও রওনা হই সিরাজগঞ্জের দিকে। 

ভাটির টানে আসতে সময় লাগে না, আমরা দেড় দিনের মধ্যে পৌঁছে যাই সিরাজগঞ্জে। জেলখানার ঘাটে এসে নামি সবাই। এক ধরণের কৌতুহল থেকে জেলখানার ভিতরে ঢুকি। পরিচিত যারা স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছে তাদেরও দেখি সেখানে আটকা থাকতে। আমাকে দেখে পরিচিতরা মুখ লুকায়। কেউ কেউ কথা বলার চেষ্টা করে, কিন্তু আমি মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বের হয়ে আসি জেলখানা থেকে।
 
পলাশডাঙ্গার প্রথম ক্যাম্প করা হয় সিরাজগঞ্জ কলেজের হোস্টেলে। কয়েকদিন সেখানে থাকার পর কলেজের পড়াশোনা শুরু হওয়ার তোড়জোর শুরু হয়, ফলে হোস্টেল ছেড়ে দিতে হয়। পলাশডাঙ্গার সবাই ঠাঁই নেয় মোক্তারপাড়ার মোড়ের সাহারা হোটেলে। এর মধ্যে জানুয়ারির মাঝামাঝি কলেজ মাঠে আমাদের অস্ত্র জমা দেওয়া হয়, অস্ত্র জমা দেওয়ার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন প্রবাসী সরকারের অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী। ধীরে ধীরে পলাশডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধারা যার যার কাজে স্কুল কলেজে বা বাড়িতে ফিরতে শুরু করেন। আমিও ফিরে যাই নিজের বাড়িতে পরিবারের কাছে। 

অনুলিখন- সাইফুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা-লেখক।  

[বীর মুক্তিযোদ্ধা জেলহোসেন মন্ডল। পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের একজন সদস্য হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি ৩ কন্যা ৩ পুত্র সন্তানের জনক। বর্তমানে খোকসাবাড়ী ইউপি সদস্য।]
  

অআই
 

যুদ্ধকথা

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানিদের হাতে থেকে রক্ষা পেতে শহর ছেড়ে প্রায় সবাই গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে, কিন্তু তাতেও রেহাই পায়নি সাধারণ মানুষ। গ্রামে গিয়ে হামলা চালিয়েছে স্বাধীনতা বিরোধীরা, অথবা জীবন রক্ষার প্রলোভন দিয়ে ডেকে নিয়ে আসা হয়েছে শহরে, নির্মমভাবে পিটিয়ে আহত করে লোকজনকে দেখাতে শহরে দেওয়া হয়েছে মহড়া। তারপর তাকে হত্যা করে পুঁতে দেওয়া হয়েছে তারই নেতার বাড়ির আঙ্গিনায়। এমন অনেক শহীদের এক জনের নাম শহীদ আবুল হোসেন গুলমহাজন (৪০)। তার পিতার নাম: রজব আলী, বাড়ি সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার দিয়ারধানগড়া গ্রামে। 

শহীদ আবুল হোসেন গুলমহাজনের স্ত্রী মোছাঃ সালেহা খাতুন (৮০) জানান, তার স্বামী আবুল হোসেন গুলমহাজন রেলে কুলির কাজ করতেন, পাশাপাশি শহরে ছিল ছোট হোটেল ব্যবসা। তার দুই সন্তান আব্দুস সালাম (৬০) ও আব্দুল আলীম (৫০)। তার স্বামী আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। যেখানেই সংগঠনের মিছিল মিটিংয়ের কর্মসূচি থাকতো সেখানেই চলে যেতেন তিনি সদলবলে। এ কারণে তিনি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন প্রিয়পাত্র। যাইহোক, ১৯৭১ সালের ২৭ এপ্রিল ভোর রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দখলে নেয় সিরাজগঞ্জ মহুকুমা শহর। তার আগেই আবুল হোসেন স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে শহর ছেড়ে চলে যান তার এক নিকটাত্মীয়ের বাড়ি সদর থানার শিয়ালকোল ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামে। পাশাপাশি চেষ্টা চলতে থাকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের খোঁজার কাজ। অপরদিকে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী সিরাজগঞ্জ শহর দখলে নিয়ে পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দল মুসলিম লিগ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমর্থকদের নিয়ে গঠন করে শান্তি কমিটি, গঠন করা হয় রাজাকার বাহিনী। শুরু হয় আওয়ামী সমর্থকদের খুঁজে বের করা। তার স্বামী আবুল হোসেনকে গ্রামের মুরুব্বিরা খবর পাঠান দেখা করার জন্য। তাকে বলা হয় যে, তাকে কিছুই করা হবে না। তিনিও সরল বিশ্বাসে চলে আসেন গ্রামের মুরুব্বির সঙ্গে দেখা করতে। 

শহীদ আবুল হোসেনের স্ত্রী মোছাঃ সালেহা খাতুন (৮০) জানান, ঘটনার পর তিনি খবর পেয়েছেন যে, তার স্বামী দিয়ারধান গড়া পীর বাড়ির সামনে আসার পর পীরের মুরিদ ও রাজাকারের তাকে আটক করে বেধড়ক মারপিট করে আধামরা করে ফেলে। পরে তাকে বেঁধে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করানো হয়। এ সময় শহরবাসীকে শোনানো হয় যে, পাকিস্তানের বিরোধীতা করা হলে এভাবেই শাস্তি পেতে হবে। শহর ঘুরিয়ে আবুল হোসেনকে নিয়ে আসা হয় মাড়োয়ারি পট্টিস্থ মহুকুমা আওয়ামী সভাপতি মোতাহার হোসেন তালুকদার এমএএর বাস ভবনের সামনে, সেখানে কৃষ্ণচূড়া গাছতলায় অর্ধমৃত অবস্থায় পুঁতে রাখা হয় তাকে। 

শহীদ আবুল ও তার দুই ছেলে
শহীদ আবুল ও তার দুই ছেলে

শহীদের বড় ছেলে আব্দুস সালাম (৬০) জানান, সিরাজগঞ্জ মুক্ত হওয়ার পর গ্রামের মানুষ ও আত্মীয় স্বজন তার বাবার কঙ্কাল  মোতাহার হোসেন তালুকদারের বাসভবনের সামনের কৃষ্ণচূড়া তলা থেকে তুলে আনে এবং গ্রামে জানাযা করা হয়। পরে সেই কঙ্কাল দাফন করা হয় মালশাপাড়া কবরস্থানে। তিনি আরো জানান, বাবা আবুল হোসেন গুলমহাজন শহীদ হওয়ার পর একই গ্রামের তার নানা সালু শেখ তাদের পরিবারকে নিয়ে ঠাঁই দেয়। তারা সেখানেই অবস্থান করছেন। শহীদের স্ত্রী সালেহা খাতুন জানান, স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুর শহীদ পরিবারের জন্য দান করা দুই হাজার টাকা পেয়েছেন। পাশাপাশি ঘর তোলার জন্য টিন টিউবওয়েল পেয়েছেন। তাকে নারী পূনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছিল, সেখান থেকে এক বছর ধরে দৈনিক দুই টাকা করে মজুরী এবং দুপুরের খাবার পেয়েছেন। সেখানে তাকে দর্জির কাজ শেখানো হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তা নানা কাজে লাগাতে পারেন নি। তার বাবা ভাইয়ের বাড়িতে থেকে তাদের সহযোগিতায় এতিম ছেলে দু’টোকে কোনও রকমে মানুষ করেছেন। পরে তাদের বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। দু’জনই এখন দেশে ফিরে এসে ঘরসংসার করে খাচ্ছে। 

শহীদের ছোট ছেলে আব্দুল আলীম (৫০) জানান, দেশের প্রায় সব নেতাই তাদের বক্তৃতায় বলেন, তিরিশ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে এদেশ স্বাধীন হয়েছে, সে তিরিশ লক্ষ শহীদের মধ্যে আমার বাবার রক্ত রয়েছে, এ জন্য আমরা গর্বিত। কিন্তু সে সব শহীদ পরিবারকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া হয়না। আমরা অর্থনৈতিক সাহায্য সহযোগিতা বা পূণর্বাসনের দাবিও করি না, কিন্তু আমরা আশা করি যে এদেশের জন্য আমাদের পরিবারের এই অবদান, এটা রাষ্ট্র মনে রাখুক। আমার পরিবারকে শহীদ পরিবারের মর্যাদা দেওয়া হোক এটাই আশা করে আমার পরিবার। 
লেখক- মুক্তিযোদ্ধা ও সিরাজগঞ্জের গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটির আহ্বায়ক।    

লেখক মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম

 

/এসিএন

যুদ্ধস্মৃতি (দ্বিতীয় পর্ব)

শ ম শহীদুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা

প্রাথমিক অবস্থায় আমাদের হাতে অস্ত্র, গোলাবারুদ ছিল কম। ৫/৬ জন মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপে দু/তিনটি করে রাইফেল আর হয়তো পঞ্চাশ রাউন্ড করে গুলি সঙ্গে রাখতে পারতাম। এ দু/তিনটি রাইফেল সবাই মিলে আগলে রাখতাম, পরিস্কার করতাম, ডিউটির সময় কাজে লাগাতাম। আমাদের সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করতেন আমাদের নেতা শেখ মোঃ আলাউদ্দিন ভাই। বাহিনী কোন দিকে যাবে, কোথায় আক্রমন করবে, তার সিদ্ধান্ত তিনিই হয়তো সিনিয়রদের কয়েকজনের পরামর্শে করে নিতেন, আমরা তা জানতে পারতাম না। তবে বুঝতাম যে, মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তার স্বার্থেই এসব করা হচ্ছে। আমাদের কোনও সময়ই বড় কোনও আক্রমনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়নি, বা আলাউদ্দিন ভাইয়ের গ্রুপ ঝুঁকিপূর্ণ কোনও আক্রমনের পরিকল্পনা নেয়নি। আমাদের চেয়ে দূর্বল স্থানে আঘাত করা, গ্রামগুলোকে স্বাধীনতা বিরোধীদের হাত থেকে মুক্ত করা- আমাদের জনযুদ্ধের এটাই ছিল কৌশল, যা আমরা অক্ষরে অক্ষরে অনূশীলন করি। আমি একটা বড় যুদ্ধে মানে রায়গঞ্জ থানা আক্রমনে অংশ নিতে পেরেছিলাম। সেখানেও আমাদের আক্রমনকারী গ্রুপের ওপর যেন শত্রুরা বাইরে থেকে এসে আঘাত করতে না পারে সেই গ্রুপে থাকতে হয়েছিল। আসলে ছোট ছোট আক্রমনের মধ্যে দিয়ে সাহস অর্জণটাই ছিল আমাদের দলের প্রধান কৌশল।

অন্যান্য গ্রুপের সঙ্গে আলাউদ্দিন ভাই সমন্বয়ের চেষ্টা করতেন। এ কারণে তাকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হতো। তিনি তার মুক্তিযোদ্ধা দলকে রায়গঞ্জ ও তাড়াশ থানা এবং নিজ এলাকা বহুলী ইউনিয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু দু/এক জন সঙ্গীকে নিয়ে চলে যেতে আরো দূরে, অন্য মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে। যেমন, বড়ইতলী গিয়েছিলেন আলাউদ্দিন ভাই। সেখানে ছিলেন বিএলএফ নেতা মোজাফ্ফর হোসেন মোজাম ভাই তার সহযোদ্ধাদের নিয়ে। সেখানে ঘেরাও দেয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারা সে ঘেরাওয়ের মধ্যে থেকে বেড়িয়ে আসতে সক্ষম হন। এ ঘটনা আমি পরে জানতে পারি।

আমাদের অস্ত্রের অভাবের কথা আগেও বলেছি। নভেম্বরের প্রথম দিকে আলাউদ্দিন ভাই আমাদের বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে যান কাজীপুরের তাড়াকান্দিতে। বেশ কিছু অস্ত্র ও গুলি সেখানকার যমুনার এক ঘাট থেকে খালাস করতে হয়। অস্ত্র ও গুলি গুলো ছিলো প্যাকেট করা, মানে একেবারেই নতুন। অস্ত্রগুলো আমরা নিয়ে আসি আমাদের এলাকায় আমাদের দলের জন্য। এতে আমাদের দলের অস্ত্রের সমস্যার কিছুটা সমাধান হয়, যা খুবই প্রয়োজন ছিল, কারণ মুক্তিযুদ্ধ তখন অনেকটাই জমে উঠেছে।

নভেম্বরের শেষের দিকে দলে দলে দেশের ভিতরে ঢুকছে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন দল। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নেপাল, ভুটান, ভারত বাংলাদেশকে দিয়েছে স্বীকৃতি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে যৌথ বাহিনী। তারা একের পর এক পাক-বাহিনীকে পরাস্থ করে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার দিকে। বাংলাদেশ হানাদার মুক্ত হওয়া হয়ে ওঠে সময়ের ব্যাপার।

ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের প্রথম দিকে আমাদের জানানো হলো যে, সিরাজগঞ্জের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। ১১ ডিসেম্বর গভীর রাতে আমরা পৌঁছে যাই সদর থানার ফুলকোচা গ্রামে। সেদিন আলাউদ্দিন ভাইয়ের দলে আমরা প্রায় ১শ’ মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম। বিশ্রাম শেষে ১২ ডিসেম্বর সকালে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো ছোনগাছা মাদ্রাসায়, সেখানে সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রুপের প্রায় এক হাজার মুক্তিযোদ্ধা জড় হয়েছে। কারণ, শৈলাবাড়ি ক্যাম্প এখান থেকে তাড়াতে না পাললে সিরাজগঞ্জ মুক্ত করা কখনোই সম্ভব নয়। আমাদের জানানো হলো, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারেরা বসেছেন যুদ্ধের কৌশল নির্দ্ধারণে, এর পর হামলা করা হবে শৈলাবাড়িতে অবস্থিত পাক-হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে। সেখানে বিপুল সংখ্যক পাক-সেনা, পুলিশ ও রাজাকার রয়েছে। সেখানে হামলা করে ছিন্নভিন্ন করে দিতে হবে পাক-হানাদার ও তার দোসরদের।

নেতাদের সিদ্ধান্ত অনূযায়ী আমাদের পজিশন দেওয়া হলো শৈলাবাড়ি ক্যাম্পের পূব পাশে ওয়াপদা বাঁধের ওপরে। পূব দিকে মুখ করে বিকেলের দিকে শুরু হলো আক্রমন। আমাদের দেশ মুক্ত করার লড়াই আর ওদের আত্মরক্ষার যুদ্ধ। এবার আমাদের অস্ত্র গোলা বারুদ ছিল, তবে পাক-হানাদার বাহিনীর তূলনায় তা স্বল্পই। আমরা যতদূর জেনেছি যে, আমাদের পক্ষে থ্রি-ইঞ্চ মর্টার, এলএমজি, ছিল থ্রিনটথ্রি এসএলআর। কিন্তু ওরা লড়ছে মরণপণ নানা ধরণের অস্ত্র দিয়ে। আধা ঘন্টা যুদ্ধ চলার পর একটি গ্রেনেড এসে পড়লো আমার পাশেই। নিয়ম অনূযায়ী তা হাতে নিয়ে ছুঁড়েও দিলাম, কিন্তু তা বেশী দূরে পাঠানো সম্ভব হলো না, পাশেই পড়ে তা বিস্ফোরিত হলো। তার টুকরো এসে লাগলো গায়ে, ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে লাগলো। আলমপুরের খালেক ছিল পাশেই, সে ক্রলিং করে এসে ওর গায়ের চাদর দিয়ে বেঁধে দিল আমার ক্ষতস্থান। আর দু’তিন এসে আমার সেবাশু¯্রষা করতে শুরু করলো। আমাকে ধরাধরি করে সরিয়ে নেওয়া হলো রণাঙ্গণ থেকে। নিয়ে যাওয়া হলো টুকরা ছোনগাছা এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বাড়িতে। এক চিকিৎসকও পাওয়া গেল সঙ্গে সঙ্গেই। তিনি আমাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিলেন। এর পরই নিয়ে যাওয়া হলো ভুড়ভুড়িয়া জাবেদ ডাক্তারের বাড়িতে। সেখানে দেখলাম, আমার মতোই আহত আরো কয়েক জনকে আনা হয়েছে। এর মধ্যে তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুল ইসলাম চৌধুরীকেও দেখতে পেলাম। তিনিও আহত হয়ে শুয়ে আছেন। তার মানে এটাই মুক্তিযোদ্ধাদের রণাঙ্গণের হাসপাতাল। এক বেলা সেখানে রেখে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো ব্যাজগাঁতী মন্টু বাবুর বাড়িতে। এলাকার লোকজন ভেঙ্গে পড়ছে মুক্তিযোদ্ধাদের দেখতে।

ইতিমধ্যেই গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়েছে যে, পাক-বাহিনী সিরাজগঞ্জ শহর ছেড়ে চলে গেছে। সিরাজগঞ্জ শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে মুক্তিযোদ্ধারা। পালিয়ে গেছে পাকিস্তানি প্রশাসনে যুক্ত থাকা লোকজনও। ১৪ ডিসেম্বর দুপুরের মধ্যেই এক ট্রাকে আমাদের মতো আহতদের তুলে নিয়ে আসা হলো সিরাজগঞ্জ কলেজ মাঠে। দ্রুত চালু করা হলো সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতাল, আলাউদ্দিন ভাই আমাকে নিয়ে ভর্তি করে দিলেন সে হাসপাতালে। বাড়ি আর এলাকা থেকে লোকজন আসতে শুরু করলো আমাকে দেখতে। কিন্তু হাসপাতালে চিকিৎসকের সংখ্যা কম, কারণ পাকিস্তান থাকা কালে যারা চাকুরি করেছেন, তারা মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে পালিয়ে গেছে। ফলে হাসপাতালে আর বাড়িতে চিকিৎসা প্রায় সমানই। তাই দু’দিন পরই বাড়িতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। বড় ভাই আব্দুর রাজ্জাক আমাকে নিতে এলেন, হাসপাতাল থেকে রিলিজের সময় উপস্থিত হলেন আলাউদ্দিন ভাই। তিনি বললেন, বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নাও, ঔষুধ পথ্য খাও, যে কোনও সময়েই কিন্তু ডাক পড়তে পারে, তখনই চলে আসার জন্য প্রস্তুত থেকো। হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। বাড়িতে ফেরার পর প্রতিদিনই মানুষের ভিড়। আত্মীয়-স্বজন আসছে, গ্রামের মানুষ, পাশ্ববর্তী গ্রামের মানুষ আসছে আমাকে মানে মুক্তিযোদ্ধাকে দেখতে, যেন আমি রূপকথার নায়ক হয়ে উঠেছি সাধারণের কাছে।

(সমাপ্ত)

অনুলিখন- সাইফুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা, লেখক

যুদ্ধস্মৃতি

শ ম শহীদুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা

যখন নতুনের ডাক আসে তখন জাতি অস্থির হয়ে ওঠে সে ডাকে সাড়া দিতে। জাতির এ অস্থির সময়ে যুব সমাজ কিছু একটা করে দেখাতে চায়। আর সে করণীয় সম্পর্কে জানতে, খুঁজতে সেও অস্থির হয়। খুঁজে বেড়ায় কখন কোথায় গেলে সে একটা কাজে লাগতে পারবে। সে তখন হন্যে হয়ে বন্ধু-স্বজন খুঁজে ফেরে লোকালয়ে, বনবাদারে, দেশ-বিদেশে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমিও তরুণ, আমিও সে অস্থিরতায় ভুগেছি, পাগলের মতো খুঁজে ফিরেছি বন্ধু-স্বজনকে। যখন খুঁজে পেয়েছি, তখন আগ্নেয়াস্ত্র তাক করেছি শত্রু হননে।

আমি শ ম শহীদুল ইসলাম। জন্ম: ১৯৫৩ সালের জুলাই মাসের ৮ তারিখে। আমার বাবার নাম এসকে আব্দুল মজিদ তালুকদার, তিনি হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক ছিলেন। মায়ের নাম ছাকিতননেসা, তিনি গৃহিণী। আমরা ৫ ভাই ১ বোন, ভাইবোনদের মধ্যে আমি পঞ্চম। এক বড় ভাই বিজি প্রেসে চাকুরি করতেন। আমার বাড়ি তৎকালীন সিরাজগঞ্জ মহুকুমার সদর থানার বহুলী ইউনিয়নের ছাব্বিশা গ্রামে। আমাদের গ্রাম বা তার আশপাশের গ্রামে কোনও হাই স্কুল ছিল না, তাই ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে উঠে সিরাজগঞ্জ শহরের ভিক্টোরিয়া হাই স্কুলে ভর্তি হই। আমার বড় ভাই আব্দুস সাত্তার তালুকদার একই স্কুলে আমার ওপরের ক্লাসে পড়তেন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সদস্য ছিলেন। আমি তার অনুসারী হয়ে উঠি, কিন্তু আমি লেখালেখি করতে  চাইতাম, হতে চাইতাম লেখক-সাংবাদিক। একারণে দলীয় কর্মকাণ্ডে কম যুক্ত হতাম। যারা লেখালেখি করতেন অথবা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন তাদের সঙ্গে গড়ে ওঠে সখ্যতা। এই সব লিখিয়ে সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে ডা. মতিয়ার রহমান, কমল গুণ, সানায়ুল্ল্যাহ শেখ, এমএ রউফ পাতা, খম আখতার, আযকার-উল হক প্রমুখের সঙ্গে আড্ডা দিতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করতাম। আর উত্তেজনাপূর্ণ মিছিল হলে তাতে অংশ নিতাম। 
১৯৬৯ সালে এসএসসি পাশ করে সিরাজগঞ্জ কলেজে ভর্তি হই, লেখালেখির সুযোগ আরো বেড়ে যায়, নিয়মিত কবিতা লিখি, সাহিত্যের আড্ডায় যাই, একটি সাপ্তাহিকে নিয়মিত সংবাদ পাঠাই। যোগাযোগ রাখি ছাত্রলীগের সঙ্গে। মধ্যে সত্তুরের নির্বাচন আসে, এলাকার তরুণদের সঙ্গে নিয়ে নাওয়া খাওয়া ভুলে ভোট চেয়ে বেড়াই আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পক্ষে, এটা যেন আমার কাছে বাঙালির অস্তিত্বের লড়াই। আমাদের আসনে নির্বাচনে সহজ বিজয় ঘটে আওয়ামী লীগের এমএনএ পদে মোতাহার হোসেন তালুকদার ও এমপিএ পদে সৈয়দ হায়দার আলীর। বিজয় ঘটে সারাদেশেই, এ বিজয় জনগণের বিজয়, বাঙালির বিজয়। আমরা নিশ্চিত হই যে, এবার পাকিস্তানকে বাঙালিদের পক্ষে শাসন করবেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দল আওয়ামী লীগ। আমি খোশ মেজাজে আবার সাহিত্য চর্চা, সাংবাদিকতা আর পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি।
কিন্তু ১৯৭১ সালের ১ মার্চে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ঘোষনায় আবারো ক্ষেপে যায় বাঙালিরা। এদিন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত ঘোষনা করা হয়। এ ঘোষনায় আমরা যারা পাকিস্তানের ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর তারা চমকে উঠি। সিরাজগঞ্জ কলেজ থেকে ছাত্ররা মিছিল বের করে। আচমকা এ মিছিলে আমরাও শহরের মধ্যে থেকে শামিল হই। ছোট্ট মিছিল কিছু সময়ের মধ্যেই হয়ে ওঠে বিশাল। মিছিলের প্রধান শ্লোগান হয়ে ওঠে ‘বাঁশের লাঠি তৈরি করো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ আর বাঙালির অপরিহার্য শ্লোগান ‘জয় বাংলা’ আরো বলিষ্ঠ কণ্ঠে উচ্চারিত হয়। এ মিছিল ঘুরিয়ে দেয় দেশের রাজনীতির চাকা। 

বাঙালিরা উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটতে থাকে। প্রতিদিনই ঘটতে থাকে নতুন নতুন ঘটনা। অসহযোগ আন্দোলন, স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ, প্রতিদিন অসহযোগ আন্দোলনের নতুন নতুন ঘোষনা আমাদের বিশ্বাস করতে বলে যে আমরা স্বাধীন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তার ঐতিহাসিক ভাষন দেন, যা আমাদের শোনার সুযোগ হয় পরের দিন সকালে। সে ভাষনে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ আমরা বুঝে গেলাম যে, বঙ্গবন্ধু এ কথার মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতার ডাক দিলেন। পরের দিনই গ্রামের আনসার সদস্য আজিজার রহমান বল্লা ভাই আমাদের নিয়ে তালুকদার বাড়ির পুকুর পাড়ে লাঠিসোটা দিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করলেন। 

এদিকে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা শেখ মোঃ আলাউদ্দিন (ধীতপুর-বহুলী} অসহযোগ আন্দোলনের শুরুতে ফিরে এলেন এলাকায়। তিনি সিরাজগঞ্জ কলেজে পড়াকালীন সময় থেকেই আমাদের সঙ্গে সখ্যতা, তিনি সংঘটিত করলেন আমাদের। বহুলী হাটখোলায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলেন তিনি। আনসার সদস্য ডা. ময়দানসহ আরো দু’তিন জন সেখানে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব নিলেন। আমরা ছাব্বিশা গ্রামের অন্তত ১৫ জন তরুণ সে প্রশিক্ষণে নাম লেখালাম। বহুলী ইউনিয়ন এলাকার শতাধিক তরুণ নাম লেখালো সে প্রশিক্ষণে। প্রশিক্ষণ নেই আর মনে মনে শপথ নেই যে, বাংলাদেশকে শত্রু মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। 

২৬ মার্চ সকাল থেকে খবর প্রচার হতে লাগলো যে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছেন। তিনি কোথায় আছেন, সে ব্যপারে দু’টো খবরই প্রচার হতে লাগলো। কেউ বলে, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, কেউ বা বলে, তিনি জনগণের মধ্যে আত্মগোপন করে আছেন। ঘটনা যাই ঘটুক, দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে তা বোঝা যেতে লাগলো। ঝড়ের আগের মূহুর্তের মতো দেশটা থমথমে হয়ে পড়তে লাগলো। দু’তিন দিনের মধ্যে অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট ভোগ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্যাতন সহ্য করে ঢাকাসহ বিভিন্ন বড় শহর থেকে গ্রামে চলে আসতে শুরু করে বাঙালিরা। তারা রাস্তায় যেতে যেতে পথে পথে বলতে থাকে পাকিস্তানিদের নির্যাতনে খবর। আমার বাড়ির সামনের রাস্তায় সে সব মানুষের মিছিল থেকে শুনতে থাকি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার কথা। এতে বাঙালিদের ক্ষোভ আরো বেড়ে যায়।

আলাউদ্দিন ভাই কয়েক জনকে নিয়ে চলে যান বাঘাবাড়িতে, পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিরোধ করবেন বলে। নানা কারণে আমি সেখানে যেতে ব্যর্থ হই। কিন্তু এলাকার নির্যাতীত মানুষের কাফেলাকে আশ্রয়, খাওয়া দিয়ে সহযোগিতা করতে থাকি। গ্রামের তরুণেরা সবাই একাট্টা হই, এগ্রাম সেগ্রামে ঘুরে বেড়াই, বলতে থাকি, স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায়? আরো বলতে থাকি যে ছাত্র-তরুণেরা এবার যে কোনও মূল্যে দেশকে স্বাধীন করবেই। ওদিকে, ২৭ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ শহরে এসে পড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। তারা যাকে যেখানে পায় তাকেই হত্যা করতে শুরু করে। বাড়িঘরে আগুন দিতে থাকে কোনও বাছবিচার ছাড়াই। প্রথম দিনেই বহুলী ইউনিয়নের ধীতপুর আলাল গ্রাম পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। সেখানে হত্যা করে বিভিন্ন গ্রামের অন্তত ৩৯ জন বাঙালিকে। তার আগেই বাঘাবাড়ি থেকে পিছিয়ে আসে মুক্তিযোদ্ধারা। ফিরে আসেন ছাত্রনেতা আলাউদ্দিন ভাইও। কিন্তু এ পরিস্থিতিতে তাকে খুঁজে পাওয়া দুস্কর হয়ে পড়ে। আমাদের গ্রামের সাইফুল, হামিদ, মজিদ, তাহের, সাইদসহ আরো কয়েক জন তাকে খুঁজে ফিরি হন্যে হয়ে । তিনি তখন প্রকাশ্যে চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন। শুধু তিনিই নন, সকল ছাত্রনেতাই তখন পলাতক। আমরা বহুলীর ছাত্র তরুণেরা ছাত্রলীগ নেতা আলাউদ্দিন ভাইয়ের ওপরেই নির্ভরশীল। তাকে না পেলে আমরা নেতৃত্বহীণ। অবশেষে ধীতপুর গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনার সপ্তাহ খানেক পর তাকে খুঁজে পাই পাশ্ববর্তী মুনশুমী গ্রামে। বহুলীসহ অন্যান্য আশপাশের ইউনিয়নের তরুণেরা তার সঙ্গে দেখা করি। তিনি জানান, তার পরিকল্পনার কথা। তিনি জানান, এসডিও শামসুদ্দিন কাজীপুরের দিকে দেখা করার কথা বলেছিলেন, তাকে এখনো খুঁজে পাইনি। এখনতো আমাদের পিছু হটে আসতে হয়েছে, একটু গুছিয়ে নিতে হবে। তোমরা যারা ছাত্রলীগ করেছ তারা কেউ বাড়িতে থাকবে না, সাবধানে আশপাশের এলাকায়ই থাকবে। আমাকেও এক/দেড় মাস পালিয়ে থাকতে হবে, পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেবো। তবে আমাদের যুদ্ধ ছাড়া কোনও পথ নেই মনে রেখ। শোনা যাচ্ছে, ভারত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, আমি সব খোঁজ খবর নিয়ে ফিরবো, তোমরা কেউ এলাকা ছাড়বে না, আবার ধরাও পড়বে না। এসব বলে আমাদের সবাইকে বিদায় করলেন।

আমি, সাইফুল, সাইদ আর মজিদ প্রায় এক সঙ্গেই পালিয়ে পালিয়ে থাকি। দিনে বের হই না বললেই চলে। রাতে প্রয়োজন মনে করলে নিজেদের মধ্যে দেখাসাক্ষাৎ আলাপ আলোচনা হয়। আশাহতাশায় দোলায়িত হয়ে সময় কাটতে থাকে। পাশ্ববর্তী গ্রামগুলোই হয়ে ওঠে আমাদের আশ্রয়। প্রায় দুই মাস পরে জুলাই মাসের প্রথম দিকে খবর পাই যে, আলাউদ্দিন ভাই ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে এলাকায় ফিরেছেন। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি যে, তিনি রায়গঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে তিনি ঘোরাফেরা করছেন। আমি, সাত্তার ভাই, সাইদ, হামিদ আর সাইফুল রায়গঞ্জের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরতে ঘুরতে তাকে পেয়ে যাই এক গ্রামে। স্বস্থি ফিরে আসে আমাদের মধ্যে। হয়তো তিনি আমাদের ভারতে প্রশিক্ষণে পাঠাবেন অথবা কোনও ব্যবস্থা করবেন। আলাউদ্দিন ভাই জানান, তিনি মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষণসহ কয়েকজনকে নিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। এখন দল গোছাবেন, আশ্রয়ের ব্যবস্থা করবেন, অন্যদের প্রশিক্ষণে পাঠাবেন। যতদিন প্রশিক্ষণে পাঠাতে না পারছেন, ততদিন স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ নিয়ে স্থানীয়ভাবে অস্ত্র সংগ্রহ করে দল চালাতে হবে। আমরা হয়ে পড়ি তার দলভূক্ত। শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধা জীবন। 

অস্ত্রের সঙ্গে পরিচয় ছিল না, আবার যুদ্ধের সময় প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগও ছিল না, আমরা যখন শেল্টারে থাকতাম, তখন সহযোদ্ধাদের কাছে থেকে থ্রিনটথ্রি রাইফেল খোলাজোড়া, টার্গেট ঠিক করা এসব শিখে নেই। আমাদের বলা হয়, সুযোগ পেলেই তোমাদের ভারতে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হবে। মাঝে এক/দুই বার তালিকাও করা হয় যে, কাকে কাকে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হবে। এভাবেই চলতে থাকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। 

আমরা মুক্তিযোদ্ধারা সাধারণত দিনে বের হতাম না বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া। গভীর রাতে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের সহযোগিতায় দল বেঁধে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে চলে যেতাম। প্রতি ৫/৬ জন মুক্তিযোদ্ধার গ্রুপ এক এক বাড়িতে একটি ঘরে থাকার ব্যবস্থা  হতো। সে ঘরটিই হয়তো ওই গৃহস্থবাড়ির মূল ঘর। এমনি একদিন এক বাড়িতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে, পরে জানতে পারি যে ওই ঘরে কিছুক্ষণ আগেই এক নারী তার সন্তান প্রসব করেছেন। আমরা চলে আসায় প্রসূতি আর তার নবজাতককে অন্য ঘরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভেবে পাইনা যে, মুক্তিযোদ্ধাদের কত গুরুত্ব দেওয়া হলে এ কাজটি সম্ভব! এভাবেই সাধরণ মানুষ গুরুত্ব দিতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের। জনগণ এ সব  করেছে মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে। আমাদের নিয়ে রাখা হতো বাড়ির ভিতরের সবচেয়ে নিরাপদ ঘরে। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা তাদের বাড়িতে গেলে তাদের খুব কষ্ট হতো, কিন্তু তারা তা হাসি মুখেই মেনে নিতেন। আরো দেখেছি, আশেপাশের মানুষ যদি জানতে পারতেন যে, কোনও বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধা আশ্রয় নিয়েছে, তাহলে তারা আমাদের দেখতে আসতো যেন মুক্তিযোদ্ধারা রূপকথার রাজপুত্তুর। আমার সহযোদ্ধাদের মধ্যে এই মূহুর্তে যাদের নাম মনে পড়ছে তারা হলেন, আব্দুস সাত্তার, সাইদ, সাইফুল, তাহের, মান্নান, মজিদ, আনোয়ার, হামিদ, আব্দুল জলিল, আজিজ, আবুল কালাম, সাবেক সেনাসদস্য সানাউল্লাহ প্রমুখ। এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের কয়েকজন সংগঠক ছিলেন, তারাই আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিতেন। কোন কোন বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নেবে তা এরাই ঠিক করে দিতেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সূবর্ণগাঁতীর বাদশা ভাই। তিনি সুপরিচিত ছিলেন রায়গঞ্জ এলাকার বিভিন্ন গ্রামে। দিনের বেলায় বিভিন্ন গ্রামে যেতেন, জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জনগণকে আশার বাণী শোনাতেন। রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গিয়ে বাড়িতে বাড়িতে ভাগ করে থাকার ব্যবস্থা করতেন।
(চলবে)
 

অনুলিখন- সাইফুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা, লেখক